আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অঘটন ঘটাবে অস্ট্রিয়া!

এশিয়া পোস্ট স্পোর্টস
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে অঘটন ঘটাবে অস্ট্রিয়া!
অস্ট্রিয়া ফুটবল দল। ছবি: সংগৃহীত

কাগজে-কলমে আজকের আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়া ম্যাচে মেসিরাই এগিয়ে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, লিওনেল মেসি প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করেছেন, আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘জে’-তে দারুণ শুরুও করেছে লিওনেল স্কালোনির দল। কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ বারবার দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যাচ্ছে না। সেই জায়গাতেই আর্জেন্টিনার সামনে অস্ট্রিয়া হয়ে উঠতে পারে অস্বস্তিকর এক পরীক্ষা।

Advertisement

রালফ রাংনিকের অস্ট্রিয়া প্রচলিত দুর্বল দল নয়। তারা শুধু রক্ষণে বসে থাকা দল নয়, আবার শুধু বলের দখল ধরে সামনে যাওয়া দলও নয়। তারা প্রতিপক্ষের ওপর দ্রুত চাপ তৈরি করে, ছিটকে আসা বলের জন্য লড়াই করে, কম পাসে সামনে যায় এবং ম্যাচকে অগোছালো করে তুলতে পারে। আর অতীত বলে আর্জেন্টিনার মতো ছন্দনির্ভর দলকে অস্বস্তিতে ফেলতে এমন ফুটবল খেলা দলই।

প্রথম ম্যাচের ফলও সেটিই বলছে। আর্জেন্টিনা আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে, অস্ট্রিয়া হারিয়েছে জর্ডানকে। দুই দলেরই পয়েন্ট ৩। গোল পার্থক্যে আর্জেন্টিনা এগিয়ে, তবে অস্ট্রিয়া যদি এই ম্যাচে জেতে, গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে চলে যাবে। আর আর্জেন্টিনা তখন শেষ ম্যাচে জর্ডানের বিপক্ষে চাপ নিয়ে নামবে।

এই ম্যাচ শুধু পয়েন্টের নয়, পথেরও। আর্জেন্টিনা জিতলে শেষ ৩২-এর দরজা অনেকটাই খুলে যাবে, অন্য ম্যাচের ফল মিললে আজই সেরা দুইও নিশ্চিত হতে পারে। কিন্তু হেরে গেলে গ্রুপসেরা হওয়ার পথ কঠিন হয়ে যাবে। তখন দ্বিতীয় হয়ে শেষ ৩২-এ উঠলে সামনে আসতে পারে গ্রুপ ‘এইচ’-এর চ্যাম্পিয়ন। সেই গ্রুপে স্পেন সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে হারিয়ে আবারও নিজেদের শক্তি দেখিয়েছে। অর্থাৎ অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ভুল মানে পরে স্পেনের মতো প্রতিপক্ষের মুখে পড়ার ঝুঁকি।

আর্জেন্টিনা-অস্ট্রিয়ার অতীত মুখোমুখি ইতিহাস খুব বড় নয়। দুই দলের দেখা হয়েছে হাতে গোনা কয়েকবার। ১৯৮০ সালে প্রীতি ম্যাচে আর্জেন্টিনা অস্ট্রিয়াকে ৫-১ গোলে হারিয়েছিল। ১৯৯০ বিশ্বকাপের আগে শেষ পরিচিত লড়াইয়ে ম্যাচটি ১-১ ড্র হয়। সেই ম্যাচে অস্ট্রিয়া দ্রুত এগিয়ে গেলেও দিয়েগো ম্যারাডোনার সহায়তায় হোর্হে বুরুচাগা আর্জেন্টিনাকে সমতায় ফেরান। অতীত তাই আর্জেন্টিনাকে পুরো নিশ্চিন্ত করছে না, আবার অস্ট্রিয়াকেও খুব বড় ইতিহাসের দাবি দিচ্ছে না।

তবে আজকের অস্ট্রিয়া অতীতের রেকর্ড দিয়ে বিচার করার দল নয়। রাংনিকের অধীনে তাদের পরিচয় পরিষ্কার—হাই প্রেসিং, ঘন রক্ষণবিন্যাস, সরাসরি আক্রমণ। বল হারালে দ্রুত চাপ, বল পেলে কম পাসে সামনে যাওয়া, আর প্রতিপক্ষের মাঝমাঠ থেকে আক্রমণ গড়ার পথ ভেঙে দেওয়া—এগুলো তাদের বড় অস্ত্র।

স্কালোনিও সেটা বুঝেছেন। অস্ট্রিয়াকে তিনি বলেছেন জটিল প্রতিপক্ষ। তার বিশ্লেষণে অস্ট্রিয়া সরাসরি ফুটবল খেলে, ভালো চাপ সৃষ্টি করে এবং ম্যাচ জিততে মাঠে নামে। এই মন্তব্যে সতর্কতা আছে। আর্জেন্টিনা জানে, অস্ট্রিয়াকে শুধু বলের দখল দিয়ে হারানো যাবে না; চাপ ভাঙতে হবে, ছিটকে আসা বল জিততে হবে, আর বল হারানোর পর বিপদ সামলাতে হবে।

আর্জেন্টিনার শক্তি কোথায়? প্রথমত মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিক শুধু গোল নয়, বার্তা। এই বয়সেও তিনি ম্যাচের গতি বদলাতে পারেন। কখন নিচে নামবেন, কখন আক্রমণের শেষ অংশে থাকবেন, কখন এক ছোঁয়ার পাস দেবেন, এই সিদ্ধান্তগুলোই আর্জেন্টিনাকে আলাদা করে।

দ্বিতীয়ত, স্কালোনির মাঝমাঠ। এনজো ফার্নান্দেস, রদ্রিগো দে পল, অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারদের উপস্থিতি আর্জেন্টিনাকে চাপ সামলানোর সুযোগ দেয়। তারা যদি দ্রুত এক-দুই পাসে অস্ট্রিয়ার প্রথম চাপ ভেঙে ফেলতে পারে, তাহলে পেছনে ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে। সেখানে আলভারেস, লাউতারো বা প্রান্তের খেলোয়াড়দের জায়গা বদল ও দৌড় গুরুত্বপূর্ণ হবে।

কিন্তু অস্ট্রিয়ার বিপদও এখানেই। তারা মাঝমাঠে সময় দেবে না। দে পল বা এনজো বল পেয়ে ঘুরতে দেরি করলে চাপ আসবে। ম্যাক অ্যালিস্টারের প্রথম ছোঁয়া ভুল হলে পাল্টা আক্রমণ শুরু হবে। আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়ার গতি একটু ধীর হলে রাংনিকের দল সেটিকে ফাঁদ বানাতে পারে।

অস্ট্রিয়ার সবচেয়ে বড় নামগুলোর মধ্যে আছেন মার্সেল সাবিৎসার, কনরাড লাইমার, নিকোলাস সাইভাল্ড, স্টেফান পস, ফিলিপ লিনহার্ট ও মার্কো আর্নাউতোভিচ। লাইমারের কাজের ক্ষমতা, একাধিক ভূমিকায় খেলার সামর্থ্য এবং চাপ ধরে রাখার অভ্যাস অস্ট্রিয়ার জন্য বড় সম্পদ। এই ধরনের খেলোয়াড়ই আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের ছন্দ ভাঙতে পারে।

আর্নাউতোভিচও আলাদা সমস্যা তৈরি করতে পারেন। বয়স হলেও তাঁর অভিজ্ঞতা, শরীরী শক্তি এবং বক্সে উপস্থিতি অস্ট্রিয়ার সরাসরি ফুটবলে কার্যকর। আর্জেন্টিনা যদি দুই প্রান্ত থেকে ক্রসের সুযোগ দেয়, বা ডেড বলের সুযোগ বেশি দেয়, তাহলে অস্ট্রিয়া বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। জর্ডানের বিপক্ষেও তারা শেষ পর্যন্ত ফল বের করে নিয়েছে, এবং সেটি দেখায় তাদের ধৈর্য আছে।

তবে অস্ট্রিয়ার জর্ডান ম্যাচও সতর্কবার্তা। তারা জিতেছে, কিন্তু সেটি একতরফা দাপটের জয় ছিল না। জর্ডান দীর্ঘ সময় তাদের কষ্ট দিয়েছে। রাংনিকও জানেন, বিশ্বকাপে এখন সহজ ম্যাচ নেই। এর মানে অস্ট্রিয়াও নিখুঁত নয়। তারা সুযোগ দেয়, চাপের সময় ফাঁক রাখে, আর আর্জেন্টিনার মতো দল সেই ফাঁক পেলে শাস্তি দিতে পারে।

ম্যাচের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পানি-পানের বিরতি। গরমের কারণে এবারের বিশ্বকাপে মাঝপথে এই বিরতি ম্যাচের ছন্দ বদলে দিচ্ছে। স্কালোনি নিজেও বলেছেন, এই বিরতি অনেকটা ছোট বিরতির মতো কাজ করতে পারে। তুলনামূলক দুর্বল দল এতে লাভবান হতে পারে, কারণ তারা শ্বাস নেওয়ার সময় পায়, রক্ষণবিন্যাস ঠিক করতে পারে এবং কোচের নির্দেশনা দ্রুত মাঠে প্রয়োগ করতে পারে।

যদি আর্জেন্টিনা শুরুতে গোল পায়, ম্যাচ অনেক সহজ হয়ে যাবে। তখন অস্ট্রিয়াকে চাপের রেখা ওপরে তুলতে হবে, পেছনে জায়গা ছাড়তে হবে। মেসি, আলভারেস, লাউতারো কিংবা প্রান্তের দৌড় তখন বেশি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু যদি প্রথম ২৫-৩০ মিনিট গোলশূন্য থাকে, অস্ট্রিয়ার আত্মবিশ্বাস বাড়বে। ম্যাচ যত দীর্ঘ সময় ০-০ থাকবে, অঘটনের সম্ভাবনা তত বাড়বে।

অস্ট্রিয়ার জন্য সবচেয়ে বাস্তব পরিকল্পনা হতে পারে শুরুতেই আর্জেন্টিনাকে অস্থির করা, মাঝমাঠে শরীরী লড়াই বাড়ানো, মেসিকে বল পাওয়ার জায়গা থেকে দূরে রাখা এবং স্থির বল থেকে সুযোগ খোঁজা। তারা যদি আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়ার পথকে সাইডলাইনের দিকে ঠেলে ফাঁদ তৈরি করতে পারে, তাহলে বল কাড়ার পর দ্রুত ক্রস বা কাটব্যাক দিয়ে হুমকি তৈরি করা সম্ভব।

আর্জেন্টিনার জন্য মূল চ্যালেঞ্জ তিনটি। প্রথমত, অস্ট্রিয়ার চাপ আতঙ্কিত না হয়ে ভাঙতে হবে। দ্বিতীয়ত, ফুলব্যাকরা ওপরে উঠলে পেছনের জায়গা সামলাতে হবে। তৃতীয়ত, অস্ট্রিয়াকে ডেড বলের সুযোগ কম দিতে হবে। মেসির দল যদি এসব জায়গায় পরিষ্কার থাকে, তাহলে তাদের মানই ম্যাচ নির্ধারণ করবে।

তবে অস্ট্রিয়ার অঘটনের পথ একেবারে অবাস্তব নয়। এবারের বিশ্বকাপে কেপ ভার্দে স্পেনকে আটকে দিয়েছে, ইরান বেলজিয়ামকে থামিয়েছে, কুরাসাও ইকুয়েডরের বিপক্ষে পয়েন্ট নিয়েছে। বড় দলের নাম এখনো মূল্যবান, কিন্তু মাঠে প্রতিটি ম্যাচে সংগঠন, শারীরিক সক্ষমতা, চাপ সৃষ্টি এবং কৌশলগত শৃঙ্খলা বড় ভূমিকা রাখছে।

আর্জেন্টিনা অবশ্য কাতারের সেই দল নয়, যারা প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হেরে চমকে গিয়েছিল। এবার শুরুটা দারুণ। স্কালোনির দল বেশি শান্ত, বেশি পরিণত এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করতে জানে। তাই অস্ট্রিয়া বিপজ্জনক হলেও আর্জেন্টিনা ভীত নয়। বরং এই ম্যাচ তাদের জন্য আরেকটি পরীক্ষা—বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল কি চাপ-নির্ভর, উচ্চ তীব্রতার প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও একই নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে?

অনুমান হিসেবে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকবে। তাদের ব্যক্তিগত মান, মেসির প্রভাব, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং বড় টুর্নামেন্টের অভিজ্ঞতা অস্ট্রিয়ার চেয়ে বেশি। কিন্তু ম্যাচের চরিত্র এমন যে অস্ট্রিয়া যদি প্রথম ঘণ্টা ধরে থাকতে পারে, বা ডেড বল থেকে আগে গোল পেয়ে যায়, তাহলে আর্জেন্টিনাকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে।

তাই প্রশ্নটি অযৌক্তিক নয়—অস্ট্রিয়া অঘটন ঘটাতে পারে। তবে সেটি ঘটাতে হলে তাদের প্রায় নিখুঁত ম্যাচ খেলতে হবে। আর্জেন্টিনাকে হারাতে হলে শুধু রক্ষণ নয়, চাপের পর আক্রমণেও সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। আর আর্জেন্টিনার কাজ হলো ম্যাচকে অস্ট্রিয়ার অগোছালো ছন্দে যেতে না দেওয়া।

মেসিদের সামনে তাই আজ শুধু আরেকটি গ্রুপ ম্যাচ নয়। এটি ছন্দ বনাম চাপ, নিয়ন্ত্রণ বনাম সরাসরি আক্রমণ, অভিজ্ঞতা বনাম তীব্রতার লড়াই। আর্জেন্টিনা জিতলে শেষ ৩২-এর পথে বড় পদক্ষেপ নেবে। অস্ট্রিয়া জিতলে সেটি হবে বিশ্বকাপের আরেকটি বড় অঘটন, আর গ্রুপ ‘জে’-এর হিসাব পুরো বদলে যাবে।