আনচেলত্তির মন্তব্যে রাগ নয়, প্রশংসাই দেখছেন স্কালোনি

আর্জেন্টিনার খেলার তীব্রতা নিয়ে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তির মন্তব্যে বিতর্ক বাড়াতে চান না মেসিদের কোচ লিওনেল স্কালোনি। বরং ব্রাজিল কোচের কথাকে সমালোচনা নয়, প্রশংসা হিসেবেই দেখছেন আর্জেন্টিনা কোচ। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে গ্রুপ ‘জে’-এর গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে সংবাদ সম্মেলনে শান্তভাবেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।
কিছুদিন আগে আনচেলত্তি বলেছিলেন, এবারের বিশ্বকাপ হতে পারে হাই প্রেসিং টুর্নামেন্ট। তার মতে, শিরোপাপ্রত্যাশী নয় এমন অনেক দলও ভালো ফুটবল খেলছে, আগ্রাসী রক্ষণ করছে এবং অনেক বেশি তীব্রতা নিয়ে লড়ছে। একই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আর্জেন্টিনা হাই প্রেসিং ফুটবল খেলে না, তবে তারা ম্যাচ খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
এই মন্তব্য ঘিরে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের ফুটবল আলোচনায় দ্রুত উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই এটিকে আর্জেন্টিনার প্রতি খোঁচা হিসেবে দেখেন। কিন্তু স্কালোনি সেই পথে হাঁটলেন না।
আর্জেন্টিনা কোচ বলেন, তিনি আনচেলত্তির কথা বুঝেছেন। তার মতে, ব্রাজিল কোচ খারাপভাবে কিছু বলেননি। বরং কথাটাকে তিনি প্রশংসা হিসেবেই নিয়েছেন। স্কালোনির ব্যাখ্যা, আনচেলত্তি বলতে চেয়েছেন আর্জেন্টিনা নিজের ছন্দ, গতি এবং ম্যাচের মুহূর্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
স্কালোনির মতে, এখন অনেক সময় এমন হয় যে কেউ কিছু বললেই সেটিকে নেতিবাচক হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু তিনি মনে করেন, আনচেলত্তি সেটি খারাপ অর্থে বলেননি। ব্রাজিল কোচ একসঙ্গে স্প্যানিশ, ইতালিয়ান ও পর্তুগিজ মিশিয়ে কথা বলায় হয়তো বক্তব্যটি আরও সহজে ভুল বোঝা হয়েছে।
আর্জেন্টিনার খেলার ধরন নিয়ে স্কালোনি আরও বলেন, তীব্রতা বলতে কী বোঝানো হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সব দল একইভাবে চাপ সৃষ্টি করে না। কেউ প্রতিপক্ষের খেলোয়াড় ধরে ধরে প্রেস করে, কেউ মাঝমাঠে ঘন রক্ষণবিন্যাস তৈরি করে, কেউ আবার বল হারানোর পর দ্রুত জায়গা বন্ধ করে। এই বিশ্বকাপে অনেক দলই নিজেদের শক্তি অনুযায়ী খেলার ধরন বদলাচ্ছে।
স্কালোনির মতে, এবারের বিশ্বকাপে মাঝমাঠের লড়াই খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অনেক দল বল ছাড়া অবস্থায় নিজেদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে খেলছে, প্রতিপক্ষকে জায়গা দিচ্ছে না। বল না থাকলে প্রতিপক্ষকে আঘাত করার সুযোগ না দেওয়াই এখন বড় বিষয়। তিনি মনে করেন, বিশ্বকাপ এখনো শুরুর পর্যায়ে, তাই পুরো টুর্নামেন্টের প্রবণতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সময় আসেনি।
তবে একটি বিষয়ে স্কালোনি নিশ্চিত, শেষ পর্যন্ত বড় দলগুলোই সামনে আসবে। প্রথম ম্যাচগুলোতে চমক থাকলেও বিশ্বকাপ যত এগোবে, অভিজ্ঞতা, বেঞ্চের শক্তি এবং ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আর্জেন্টিনার নজর এখন অবশ্য আনচেলত্তির মন্তব্যে নয়, অস্ট্রিয়া ম্যাচে। আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকে শুরুটা নিখুঁত হলেও স্কালোনি জানেন, অস্ট্রিয়া আলাদা ধরনের পরীক্ষা।
অস্ট্রিয়াও প্রথম ম্যাচে জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে। রালফ রাংনিকের দল সংগঠিত, সরাসরি আক্রমণ পছন্দ করে এবং প্রতিপক্ষের ওপর দ্রুত চাপ তৈরি করে। তারা বেশি সময় ধরে বল ঘুরিয়ে খেলা গড়ে না তুললেও দ্রুত সামনে যায়, প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে এবং ছিটকে আসা বলের লড়াইয়ে শক্ত থাকে। স্কালোনির চোখে, অস্ট্রিয়া এমন দল যাদের অবহেলা করার সুযোগ নেই।
আর্জেন্টিনা কোচ বলেন, অস্ট্রিয়া শক্ত প্রতিপক্ষ। তাদের ভালো খেলোয়াড় আছে, তারা ভালো চাপ সৃষ্টি করে এবং সরাসরি ফুটবল খেলে। বাছাইপর্বেও তারা ভালো করেছে। স্কালোনির মতে, দুই দলই প্রথম ম্যাচ জিতেছে, তাই ম্যাচটি কঠিন হবে।
এই বিশ্বকাপের আরেকটি বিষয় নিয়েও কথা বলেছেন স্কালোনি, পানি-পানের বিরতি। অনেক ম্যাচেই তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে মাঝপথে বিরতি দেওয়া হচ্ছে। তার মতে, এই বিরতিগুলো ম্যাচের গতি বদলে দিতে পারে। তুলনামূলক দুর্বল দলও এতে লাভবান হতে পারে, কারণ বিরতির সময় তারা বিশ্রাম নিতে পারে, নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারে এবং কোচের কাছ থেকে নতুন নির্দেশনা পায়।
স্কালোনির মতে, বিশ্বকাপে সহজ ম্যাচ বলে কিছু নেই। গ্রুপ পর্ব আগে কখনোই সহজ ছিল না, এখন ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে প্রতিটি পয়েন্ট আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দল রক্ষণে ঘন হয়ে খেলছে, ফাঁকা জায়গা কম দিচ্ছে, আর বিরতির সময় পরিকল্পনা বদলাচ্ছে। তাই শুধু নাম দেখে ম্যাচ জেতা যায় না।
অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার সামনে বড় সুযোগও আছে। জিতলে তারা ৬ পয়েন্টে উঠবে এবং শেষ ৩২-এর দরজা অনেকটাই খুলে যাবে। অন্য ম্যাচের ফল মিললে এক ম্যাচ হাতে রেখেই গ্রুপের সেরা দুই নিশ্চিত হতে পারে। তবে হারলে গ্রুপসেরা হওয়ার পথ জটিল হয়ে যাবে এবং শেষ ৩২-এর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে সামনে আসতে পারে স্পেনের মতো দল।
এই কারণেই স্কালোনি আবেগের বদলে বাস্তবতায় মন দিচ্ছেন। আনচেলত্তির মন্তব্য নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হলেও তিনি সেটিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন। তার দলের সামনে এখন কাজ একটাই, অস্ট্রিয়াকে সামলানো, গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং নকআউটের পথ যতটা সম্ভব সহজ রাখা।
।






