মাটিতে পড়েও যে হাতে বাঁচল ইরানের স্বপ্ন

ফিফা বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জি’-এর ম্যাচে বেলজিয়ামের সামনে ইরানের গোলবারে দাঁড়িয়ে ছিলেন এক দেয়াল। নাম আলিরেজা বেইরানভান্দ। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে তার শরীর, হাত, পা, প্রতিক্রিয়া আর বিশ্বাস মিলে তৈরি করল টিম মেল্লির জন্য এক অবিশ্বাস্য রাত। বেলজিয়াম বারবার আক্রমণে উঠেছে, সুযোগও তৈরি করেছে, তবু গোল পায়নি। কারণ ইরানের গোলপোস্টে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই মানুষ, যিনি বহু আগেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই জিতে এসেছেন।
গ্রুপ ‘জি’-এর ম্যাচে বেলজিয়ামের সঙ্গে ০-০ ড্র করেছে ইরান। ফলটা কাগজে এক পয়েন্ট, কিন্তু বাস্তবে এটি ইরানের জন্য অনেক বড় অর্জন। কারণ এই বিশ্বকাপে ইরানের পথ অন্যদের মতো সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ-সংক্রান্ত বিধিনিষেধের কারণে দলটির বেস যুক্তরাষ্ট্রে নয়, মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। ম্যাচ খেলতে তাদের সীমিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে হচ্ছে, ম্যাচ শেষে আবার ফিরে যেতে হচ্ছে। এই ক্লান্তিকর যাত্রার মাঝেও বেলজিয়ামের মতো দলকে আটকে রাখা সহজ ছিল না।
কিন্তু বেইরানভান্দ সহজ গল্পের মানুষ নন।
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তটি আসে দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি। কেভিন ডি ব্রুইনা অসাধারণ নিয়ন্ত্রণে বল ধরে কাটব্যাক করেন। ম্যাক্সিম দে কুইপার প্রায় নিশ্চিত গোলের সামনে ছিলেন। বেইরানভান্দ তখন প্রায় মাটিতে পড়ে গেছেন, গোল যেন খালি। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে হাত বাড়িয়ে বল ঠেকিয়ে দেন তিনি। ওই সেভ শুধু বেলজিয়ামকে গোল থেকে বঞ্চিত করেনি, ম্যাচের পুরো মানসিকতাও বদলে দেয়।

এমন সেভ কোনো সাধারণ গোলরক্ষকের গল্প নয়। বেইরানভান্দের জীবনও সাধারণ নয়।
ইরানের লোরেস্তান অঞ্চলের দরিদ্র যাযাবর পরিবারে জন্ম তাঁর। শৈশব কেটেছে অভাব, কষ্ট আর সীমাবদ্ধতার মধ্যে। পরিবারে ফুটবলকে নিরাপদ ভবিষ্যৎ মনে করা হয়নি। বাবাও চাননি ছেলে ফুটবল খেলুক। কিন্তু বেইরানভান্দের স্বপ্ন ছিল গোলপোস্টের নিচে দাঁড়ানো। সেই স্বপ্ন নিয়েই কিশোর বয়সে তিনি ঘর ছাড়েন।
🇮🇷 Alireza Beiranvand, el arquero iraní que hoy fue figura ante Bélgica, tiene una historia increíble. De familia nómade, su padre, pastor, no quería que se dedique al fútbol. "Eso es un juego, no un trabajo". Siendo un adolescente, se tuvo que escapar a Teherán solo. Vivió en… pic.twitter.com/RMCSQ3deIb
— Nahuel Lanzón (@nahuelzn) June 21, 2026
পকেটে ছিল সামান্য টাকা, সামনে ছিল অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তিনি চলে যান তেহরানে। সেখানে তাঁর থাকার জায়গা ছিল না, পরিচিত কেউ ছিল না। ফুটবল ক্লাবের আশপাশে রাত কাটাতেন। কখনো রাস্তায়, কখনো ক্লাবের দরজার কাছে। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, যদি কষ্ট করতেই হয়, তবে ফুটবলের কাছেই থাকা ভালো।
টিকে থাকার জন্য নানা কাজ করেছেন তিনি। পোশাক কারখানায় কাজ, গাড়ি পরিস্কার করেছেন, রাস্তা পরিষ্কার করা, পিৎজার দোকানে কাজ, সবই করেছেন। দিনের কাজের পরও স্বপ্ন ছাড়েননি। গোলরক্ষকের গ্লাভস কিনতেও যেখানে অর্থ ছিল না, সেখানে বিশ্বকাপের গোলপোস্টে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখা অনেকের কাছে পাগলামি মনে হতে পারত। কিন্তু বেইরানভান্দ সেই পাগলামিকেই জীবন বানিয়েছেন।
তার শরীরী শক্তির পেছনেও আছে শৈশবের গল্প। পাহাড়ি জীবনে পাথর ছোড়ার স্থানীয় খেলায় তিনি ছোটবেলা থেকেই অভ্যস্ত ছিলেন। সেই অভ্যাস তার হাতে তৈরি করেছিল অস্বাভাবিক শক্তি। পরে সেই শক্তিই ফুটবলে পরিণত হয় তার বড় অস্ত্রে।
বেইরানভান্দ শুধু সেভের জন্য বিখ্যাত নন। তিনি গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডধারী গোলরক্ষকও। প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল ম্যাচে সবচেয়ে দূরে বল থ্রো করার রেকর্ড তার। ২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে তিনি ৬১ মিটারের বেশি দূরে বল ছুড়েছিলেন। তার নামে সবচেয়ে দূরের ফুটবল ড্রপ কিকের রেকর্ডও আছে। একজন গোলরক্ষকের বল যে আক্রমণের অস্ত্র হতে পারে, বেইরানভান্দ তা অনেক আগেই দেখিয়েছেন।
Maçında kahramanı Alireza Beiranvand'ı biz asıl eliyle 60 metre yolladığı inanılmaz toplarla tanıyoruz. Bu yeteneğini, mensubu olduğu göçebe Lur halkının bir geleneği olan taş fırlatma oyununa borçlu. Futbolcu olmak için evden kaçmadan önce çobanmış. pic.twitter.com/OlbaqxZ5b8 https://t.co/SUAkxNGhEP
— Yiğit Deniz (@altligleren) June 21, 2026
তবে বেলজিয়ামের বিপক্ষে রাতে তার লং থ্রো বা ড্রপ কিক নয়, আলো কেড়ে নেয় তার শট থামানোর ক্ষমতা। প্রথমার্ধেই তিনি বেলজিয়ামের কয়েকটি চেষ্টা ঠেকান। অন্য প্রান্তে থিবো কুর্তোয়াও ইরানকে গোল পেতে দেননি। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে দে কুইপারের শট ঠেকানো সেভটাই ম্যাচের ছবি হয়ে থাকে। ডি ব্রুইনা, লুকাকু, ট্রসার্ড, টিয়েলেমানসদের সামনে তার শান্ত থাকা ছিল ইরানের বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ।
ইরানেরও সুযোগ ছিল। মেহদি তারেমি সেট পিস থেকে বল জালে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ভিএআর দেখে অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। পরে বেলজিয়ামের নাথান এনগয় লাল কার্ড দেখলে ইরান একজন বেশি নিয়ে খেলতে শুরু করে। চাইলে তারা আরও ঝুঁকি নিতে পারত। কিন্তু কোচ আমির গালেনোইয়ের দল সতর্ক ছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল ম্যাচ না হারানো, শেষ ম্যাচের আগে আশা ধরে রাখা।
সে লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। দুই ম্যাচে দুই ড্র নিয়ে ইরান এখনো অপরাজিত। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২, বেলজিয়ামের সঙ্গে ০-০। শেষ ম্যাচে মিসরের বিপক্ষে তাদের হাতে থাকবে নকআউটে ওঠার সুযোগ।
Busquen el mejor gol, porque la mejor atajada del mundial YA LA TENEMOS 😱
— 𝗔𝗻𝗱𝗲𝗿 𝗖𝗮𝗱𝗲𝗻𝗮 (@AnderCadena1) June 21, 2026
🧤 Beiranvand 🇮🇷 pic.twitter.com/WjjykkKcJD
এই অর্জনকে শুধু ফুটবল রেজাল্ট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ ইরান খেলছে অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। অন্য দল যেখানে স্থায়ী বেস, নিয়মিত ট্রেনিং ও স্বাভাবিক প্রস্তুতি পাচ্ছে, সেখানে ইরানকে প্রতিটি যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের আগে সীমিত সময়ের ভ্রমণ সামলাতে হচ্ছে। তবু মাঠে তারা শৃঙ্খলা হারায়নি। বরং এই চাপই যেন তাদের আরও জেদি করে তুলেছে।
আর সেই জেদের মুখ হয়ে উঠেছেন বেইরানভান্দ।
একসময় যে ছেলে ক্লাবের দরজার বাইরে ঘুমাতেন, আজ তিনি বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত সেভগুলোর একটি করেছেন। যে ছেলের স্বপ্নকে অনেকে অবাস্তব বলেছিল, তিনি আজ বেলজিয়ামের আক্রমণ থামিয়ে বিশ্বকাপের বড় গল্প হয়ে উঠেছেন। তার জীবন যেন ফুটবলের সেই পুরোনো সত্যকে আবার মনে করিয়ে দেয়, প্রতিভা শুধু আরাম থেকে জন্ম নেয় না, অনেক সময় সবচেয়ে কঠিন রাস্তা থেকেই উঠে আসে সবচেয়ে বড় চরিত্র।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ে ইরানের নায়ক অনেকজন। রক্ষণে সবাই লড়েছে, তারেমি সামনে চাপ দিয়েছে, কুর্তোয়ার সামনে সুযোগও তৈরি হয়েছে। কিন্তু শেষ ছবি একটাই, মাটিতে পড়ে থেকেও হাত বাড়িয়ে বল ঠেকাচ্ছেন বেইরানভান্দ।
ওই সেভই যেন তার জীবনকাহিনির সংক্ষিপ্ত রূপ। পরিস্থিতি বিপক্ষে, শরীর প্রায় মাটিতে, তবু শেষ মুহূর্তে উঠে দাঁড়ানোর মতো এক হাত। সেই হাতেই বেঁচে থাকল ইরানের বিশ্বকাপ স্বপ্ন।







