অস্ট্রিয়ার কাছে আর্জেন্টিনা হারলে কী হবে?

আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেছে আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসির হ্যাটট্রিকে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা গ্রুপ ‘জে’-এর শীর্ষে আছে। কিন্তু সামনে অস্ট্রিয়া। আর এই ম্যাচে যদি বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের হার বদলে দিতে পারে মেসিদের নকআউট পথ।
অস্ট্রিয়াও নিজেদের প্রথম ম্যাচে জর্ডানকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে। পয়েন্ট দুই দলেরই ৩। গোল পার্থক্যে আর্জেন্টিনা এগিয়ে থাকলেও অস্ট্রিয়া ম্যাচে হারলে পরিস্থিতি পুরোপুরি পাল্টে যাবে। তখন অস্ট্রিয়া চলে যাবে ৬ পয়েন্টে, আর্জেন্টিনা থাকবে ৩ পয়েন্টে।
নতুন ৪৮ দলের বিশ্বকাপে শেষ ৩২-এ যাবে প্রতিটি গ্রুপের সেরা দুই দল এবং সেরা আট তৃতীয় দল। তাই অস্ট্রিয়ার কাছে হারলেই আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাবে না। কিন্তু গ্রুপসেরা হওয়ার পথ তখন কঠিন হয়ে যাবে। আর সেটিই সবচেয়ে বড় চিন্তার জায়গা।
কারণ গ্রুপ ‘জে’-এর রানার্সআপের সামনে শেষ ৩২-এ অপেক্ষা করবে গ্রুপ ‘এইচ’-এর চ্যাম্পিয়ন। এই মুহূর্তে সেই গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে স্পেন। সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে হারিয়ে ইউরো চ্যাম্পিয়নরা দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্র করলেও দ্বিতীয় ম্যাচে লামিনে ইয়ামাল ও মিকেল ওয়ারসাবালের দাপটে স্পেন আবার নিজেদের ফেভারিট পরিচয় ফিরিয়ে এনেছে।
অর্থাৎ আর্জেন্টিনা যদি অস্ট্রিয়ার কাছে হারে এবং পরে জর্ডানকে হারিয়ে গ্রুপে দ্বিতীয় হয়, তাহলে শেষ ৩২-এ তাদের সামনে আসতে পারে স্পেন। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার জন্য সেটি হবে গ্রুপ পর্বের পরই এক বিশাল পরীক্ষা। স্বাভাবিকভাবেই যেকোন দলই শুরুতে এই পরীক্ষায় পড়তে চাইবে না।
আর্জেন্টিনার হিসাব তাই সহজ, কিন্তু চাপের। অস্ট্রিয়াকে হারালে তারা ৬ পয়েন্টে যাবে এবং শেষ ৩২-এর খুব কাছে চলে যাবে। সেই সঙ্গে গ্রুপসেরা হওয়ার পথও নিজেদের হাতে থাকবে। ড্র করলেও ক্ষতি খুব বড় হবে না। তখন আর্জেন্টিনা ৪ পয়েন্টে থাকবে, অস্ট্রিয়ারও হবে ৪। শেষ ম্যাচে জর্ডানকে হারালে গ্রুপসেরা হওয়ার সুযোগ থাকবে।
কিন্তু হারলে চিত্র আলাদা। অস্ট্রিয়া ৬ পয়েন্টে চলে গেলে আর্জেন্টিনার সামনে শেষ ম্যাচে জর্ডানকে হারানো জরুরি হয়ে যাবে। ৬ পয়েন্টে উঠলে শেষ ৩২ নিশ্চিত হওয়ার কথা, কিন্তু গ্রুপসেরা হওয়ার সুযোগ প্রায় থাকবে না। কারণ অস্ট্রিয়ার সঙ্গে সমান পয়েন্টে শেষ করলেও মুখোমুখি লড়াইয়ের ফল আর্জেন্টিনাকে পিছিয়ে দিতে পারে।
এই কারণেই অস্ট্রিয়া ম্যাচটি শুধু দ্বিতীয় গ্রুপ ম্যাচ নয়, নকআউট পথ নির্ধারণের ম্যাচ। আর্জেন্টিনা হারলে তাদের লক্ষ্য বদলে যাবে, গ্রুপসেরা থেকে নিরাপদে দ্বিতীয় হওয়া। আর দ্বিতীয় হলেই সামনে থাকতে পারে গ্রুপ ‘এইচ’-এর সেরা দল।
গ্রুপ ‘এইচ’-এর হিসাব এখনো শেষ হয়নি। স্পেন ৪ পয়েন্টে শক্ত অবস্থানে আছে। সৌদি আরবের পয়েন্ট ১। উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দে একটি করে ম্যাচ খেলেছে, দুদলেরই পয়েন্ট ১। উরুগুয়ে এখনো হিসাব পাল্টে দিতে পারে। কেপ ভার্দেও স্পেনকে আটকে দিয়ে দেখিয়েছে, তারা সহজ প্রতিপক্ষ নয়। তবু বর্তমান অবস্থায় গ্রুপ ‘এইচ’-এর চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার স্পেন।
আর সেখানেই আর্জেন্টিনার জন্য বিপদ। বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এ সাধারণত বড় দলগুলো সহজ পথ খুঁজতে চায়। কিন্তু গ্রুপে একবার ভুল করলে সেই পথ কঠিন হয়ে যায়। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে হার মানে আর্জেন্টিনা হয়তো শেষ ৩২-এ যাবে, কিন্তু প্রতিপক্ষ হতে পারে স্পেনের মতো দল।
মেসিদের জন্য অস্ট্রিয়া মোটেও সহজ প্রতিপক্ষ নয়। রালফ রাংনিকের দল সংগঠিত, প্রেসিং-নির্ভর এবং শারীরিকভাবে শক্তিশালী। জর্ডানের বিপক্ষে ৩-১ জয়ে তারা দেখিয়েছে, সুযোগ পেলে দ্রুত ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে। আর্জেন্টিনাকে তাই শুধু বলের দখল নয়, ট্রানজিশন সামলাতেও সতর্ক থাকতে হবে।
আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয় ছিল নিখুঁত। মেসির হ্যাটট্রিক, রক্ষণে ক্লিন শিট, মাঝমাঠে নিয়ন্ত্রণ, সব মিলিয়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের শুরুটা দারুণ। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচের বড় জয় অনেক সময় ভুল নিরাপত্তাবোধও তৈরি করে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে সেই ফাঁদে পড়া যাবে না।
স্কালোনির দলের জন্য সবচেয়ে ভালো সমীকরণ পরিষ্কার, অস্ট্রিয়াকে হারাও, গ্রুপসেরা হওয়ার রাস্তা ধরে রাখো। ড্র করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে। কিন্তু হারলেই হিসাব চলে যাবে অন্য দিকে। তখন জর্ডান ম্যাচ হবে চাপের, আর শেষ ৩২-এর সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ হিসেবে স্পেনের নাম বড় হয়ে উঠবে।
যদি আর্জেন্টিনা অস্ট্রিয়ার কাছে হেরে যায় এবং পরে জর্ডানকেও হারাতে না পারে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। ৪ পয়েন্টে শেষ করলে তৃতীয় হওয়া বা সেরা তৃতীয় দলের হিসাবেও যেতে হতে পারে। ৩ পয়েন্টে শেষ করলে বিদায়ের শঙ্কা তৈরি হবে। তাই অস্ট্রিয়া ম্যাচে পয়েন্ট নেওয়া আর্জেন্টিনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন বিশ্বকাপ ফরম্যাটে অনেক দলই তৃতীয় হয়েও টিকে থাকবে। কিন্তু আর্জেন্টিনার মতো দলের লক্ষ্য শুধু টিকে থাকা নয়। তাদের লক্ষ্য পথ নিয়ন্ত্রণ করা। আর সেই পথ নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রুপসেরা হওয়া জরুরি। কারণ গ্রুপসেরা হলে শেষ ৩২-এ তুলনামূলক সুবিধাজনক প্রতিপক্ষ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দ্বিতীয় হলেই সামনে আসতে পারে গ্রুপ ‘এইচ’-এর চ্যাম্পিয়ন, যার সবচেয়ে বড় দাবিদার এখন স্পেন।
সুতরাং অস্ট্রিয়া ম্যাচ আর্জেন্টিনার জন্য শুধু ছয় পয়েন্টের লড়াই নয়। এটি মেসিদের বিশ্বকাপ পথের বাঁকবদলের ম্যাচ। জিতলে নকআউটের দরজা প্রায় খুলে যাবে। ড্র করলে হিসাব হাতে থাকবে। কিন্তু হারলে শেষ ৩২-এ স্পেনের মুখোমুখি হওয়ার পথেই হাঁটতে হতে পারে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের।







