ভ্রমণ-ঝক্কির মাঝেও বেলজিয়ামকে আটকে দিল ইরান

মাঠের বাইরে ভ্রমণ জটিলতা, প্রস্তুতির সময় কমে যাওয়া, কঠোর বিধিনিষেধ, সবকিছুর মাঝেও বিশ্বকাপে আরেকটি মূল্যবান পয়েন্ট তুলে নিল ইরান। লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘জি’-এর ম্যাচে ফেবারিট বেলজিয়ামকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়েছে আমির গালেনোইয়ের দল।
বিশ্বকাপে ইরানের পথটা অন্য সবার মতো সহজ নয়। ম্যাচ খেলতে তাদের মেক্সিকোর তিহুয়ানা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হচ্ছে, আবার ম্যাচ শেষে ফিরে যেতে হচ্ছে বেসে। প্রস্তুতির সময় কম, ভ্রমণ-ক্লান্তি বেশি, মাঠের বাইরের চাপও কম নয়। কিন্তু মাঠে নেমে ইরান যেন এসব কিছুকেই আলাদা শক্তিতে বদলে দিচ্ছে।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে গ্রুপ ‘জি’-এর ম্যাচে বেলজিয়ামকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়েছে ইরান। স্কোরলাইন ০-০, কিন্তু ম্যাচের সবচেয়ে বড় গল্প ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজা বেইরানভান্দ। তার কয়েকটি সেভ, বিশেষ করে ম্যাক্সিম দে কুইপারের শট ঠেকানো অবিশ্বাস্য সেভ, ম্যাচটিকে বিশ্বকাপের আলোচনায় তুলে দিল।
বেলজিয়াম বলের দখলে ছিল অনেক এগিয়ে। আক্রমণ করেছে বেশি, গোলের সুযোগও তৈরি করেছে। কিন্তু ইরান রক্ষণে ছিল সংগঠিত, মানসিকতায় দৃঢ়, আর শেষ প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন বেইরানভান্দ। সেই কারণেই বেশি সুযোগ পেয়েও গোল পায়নি রুডি গার্সিয়ার দল।
ম্যাচের শুরুতে বেলজিয়াম আক্রমণাত্মক ছিল। রোমেলু লুকাকুকে শুরু থেকে নামান রুডি গার্সিয়া। তার শারীরিক উপস্থিতি ইরান রক্ষণকে শুরুতেই চাপে ফেলে। শুরুতেই বেইরানভান্দের সঙ্গে চ্যালেঞ্জে পা বেশি উঁচু তুলে হলুদ কার্ড দেখেন লুকাকু। সেটি আরও কঠোর শাস্তিও হতে পারত বলে ইরান খেলোয়াড়দের আপত্তি ছিল।
বেলজিয়াম ডি ব্রুইনা, ট্রসার্ড ও টিয়েলেমানসকে দিয়ে ইরানের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ইরানও শুধু বসে ছিল না। সেট পিস থেকে কয়েকবার বেলজিয়ামকে অস্বস্তিতে ফেলে তারা। হোসেইন কানানিজাদেগানের ভলি দারুণভাবে ঠেকান থিবো কুর্তোয়া। সেই সেভ না হলে ম্যাচের গল্প অন্যরকমও হতে পারত।
প্রথমার্ধের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে সেট পিস থেকেই। এহসান হাজসাফির বুদ্ধিদীপ্ত ফ্রি-কিক থেকে মেহদি তারেমি ঘুরে শট নিয়ে বল জালে পাঠান। ইরান শিবিরে উদ্যাপন শুরু হলেও ভিএআর পরীক্ষা শেষে গোল বাতিল হয়। ফ্রি-কিক নেওয়ার মুহূর্তে তারেমি অল্পের জন্য অফসাইডে ছিলেন। গোল না হলেও সেটি দেখিয়ে দেয়, ইরান পরিকল্পনা করে বেলজিয়ামকে আঘাত করতে এসেছিল।
প্রথমার্ধে বেলজিয়ামের দখল ছিল একতরফা। কিন্তু গোলের সামনে তাদের ধার ছিল না। বেইরানভান্দ বেলজিয়ামের একের পর এক প্রচেষ্টা সামলান। ইরানের রক্ষণ বারবার ব্লক করে, বক্সের ভেতরে জায়গা কমিয়ে দেয়, আর বেলজিয়ামকে বাইরে বাইরে পাস খেলতে বাধ্য করে।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আরেকটি বিতর্কিত মুহূর্ত আসে। সদ্য নামা আলিরেজা জাহানবখশ ট্রসার্ডের পায়ে স্টাড উঁচুতে রেখে চ্যালেঞ্জ করেন। ট্রসার্ড মাটিতে পড়ে ব্যথায় কাতর হন, ছেঁড়া মোজাও দেখান রেফারিকে। কিন্তু হলুদ কার্ডও দেখানো হয়নি, ভিএআরও হস্তক্ষেপ করেনি। বেলজিয়াম এতে ক্ষুব্ধ হলেও রেফারির সিদ্ধান্ত বদলায়নি।
এরপর কুর্তোয়া আবার বেলজিয়ামকে বাঁচান। তারেমি বক্সে বল পেয়ে দ্রুত শট নেন, কিন্তু কুর্তোয়ার প্রতিক্রিয়া ছিল দুর্দান্ত। ইরান বুঝিয়ে দেয়, বলের দখলে পিছিয়ে থাকলেও সুযোগ পেলে তারা বিপজ্জনক।
তারপর আসে ম্যাচের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। ডি ব্রুইনার অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ ও পাসে দে কুইপার প্রায় নিশ্চিত গোলের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। বেইরানভান্দ তখন প্রায় মাটিতে পড়ে। সবাই ধরে নিয়েছিল বেলজিয়াম এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ইরানি গোলরক্ষক অবিশ্বাস্যভাবে হাত বাড়িয়ে বল ঠেকিয়ে দেন। সেই সেভ শুধু ম্যাচ বাঁচায়নি, বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা সেভ হিসেবেও আলোচনায় উঠে এসেছে।
এই সেভের পর বেলজিয়ামের অস্বস্তি আরও বাড়ে। ৬৬ মিনিটে নাথান এনগয় ভয়াবহ ভুল করেন। মাঝমাঠে ব্যাক পাস ছোট হয়ে যায়, তারেমি চাপ দেন, আর শেষ ডিফেন্ডার হিসেবে তাকে ফেলে দেন এনগয়। রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান। শেষ প্রায় আধঘণ্টা বেলজিয়াম খেলেছে ১০ জন নিয়ে।
এখানেই ইরানের সামনে সুযোগ ছিল ম্যাচ জিতে নেওয়ার। কিন্তু গালেনোইয়ের দল অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয়নি। তারা রক্ষণে ভারসাম্য ধরে রাখে, বেলজিয়ামের ভুলের অপেক্ষা করে। শেষ দিকে সাঈদ এজাতোলাহির শট দুই ধাপে সামলান কুর্তোয়া। সেটি ছিল শেষ ভাগে ইরানের বড় সুযোগগুলোর একটি।
বেলজিয়ামও ১০ জন নিয়ে পুরোপুরি থেমে যায়নি। লুকাকুকে তুলে রক্ষণে ভারসাম্য ফেরান গার্সিয়া। শেষ দিকে দোদি লুকেবাকিও, দে কুইপার ও টিয়েলেমানসরা চেষ্টা চালিয়ে যান। দে কুইপারের আরেকটি শট আবার ঠেকান বেইরানভান্দ। যোগ করা সময়ে লুকেবাকিওর কার্লিং শট অল্পের জন্য বাইরে যায়।
শেষ পর্যন্ত গোল আসেনি। বেলজিয়ামের জন্য এটি বড় হতাশা। প্রথম ম্যাচে মিসরের সঙ্গে ১-১ ড্রয়ের পর এবার ইরানের সঙ্গে ০-০। কেভিন ডি ব্রুইনা, লুকাকু, কুর্তোয়া, টিয়েলেমানসদের দল কাগজে শক্তিশালী, কিন্তু মাঠে এখনো নিজেদের মতো করে বিশ্বকাপ শুরু করতে পারেনি। জেরেমি দকু অসুস্থতার কারণে এই ম্যাচে ছিলেন না, সেটিও বেলজিয়ামের আক্রমণ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলেছে।
ইরানের জন্য ছবিটা একেবারে আলাদা। দুই ম্যাচে দুই ড্র, কিন্তু প্রতিপক্ষ ছিল নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়াম। ভ্রমণ-ঝক্কি, বিধিনিষেধ, প্রস্তুতির ঘাটতি সত্ত্বেও তারা এখনো অপরাজিত। সবচেয়ে বড় কথা, শেষ ম্যাচের আগে তাদের ভাগ্য এখনো নিজেদের হাতে।
গ্রুপ ‘জি’-এর শেষ রাউন্ডে ইরান খেলবে মিসরের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে জয় পেলে শেষ ৩২-এর দরজা খুলে যেতে পারে। বেলজিয়াম খেলবে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। গ্রুপের হিসাব এখনো খোলা, কিন্তু ইরান দেখিয়ে দিয়েছে, তাদের সহজে হারানোর দল ভাবা ভুল।







