ইতিহাসের সামনে উরুগুয়ে-কেপ ভার্দে ম্যাচ

বিশ্বকাপে আর কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হতে যাওয়া উরুগুয়ে-কেপ ভার্দে ম্যাচ তৈরি হতে যাচ্ছে এক অদ্ভুত ইতিহাস। মায়ামিতে মুখোমুখি হবে দু’দল। তবে মাঠের লড়াইয়ের বাইরে এই ম্যাচ আলাদা হয়ে থাকবে দুই দেশের জনসংখ্যার কারণেও। দুই দেশ মিলিয়ে জনসংখ্যা ৪০ লাখেরও কম। পরিসংখ্যানভিত্তিক আলোচনায় বলা হচ্ছে, বিশ্বকাপ ইতিহাসে এত ছোট সম্মিলিত জনভিত্তির দুই দেশের ম্যাচ খুব কমই দেখা গেছে, এমনকি এটিই হতে পারে সবচেয়ে ছোট জনভিত্তির ম্যাচ।
এখানে দর্শকসংখ্যা বলতে স্টেডিয়ামে উপস্থিত দর্শক বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে দুই দেশের মোট জনসংখ্যা বা সম্ভাব্য সমর্থকভিত্তি। উরুগুয়ের জনসংখ্যা প্রায় ৩৩.৮ লাখ। আর কেপ ভার্দের জনসংখ্যা প্রায় ৫.৩ লাখ। সব মিলিয়ে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ লাখের কিছু বেশি।
বিশ্বকাপের মতো আসরে যেখানে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, জার্মানি, ইংল্যান্ডের মতো বড় ফুটবল জনভিত্তির দেশগুলোর ম্যাচে কোটি কোটি মানুষের নজর থাকে, সেখানে ৪০ লাখেরও কম মানুষের দুই দেশের লড়াই এক বিরল ঘটনা। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসে এই ছোট জনসংখ্যার দেশ দুটি নিজেদের জায়গা বানিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন পথে।
উরুগুয়ে বিশ্বকাপের পুরোনো শক্তি। দেশ ছোট হলেও ফুটবল ইতিহাসে তাদের অবস্থান বিশাল। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল উরুগুয়ে। এরপর ১৯৫০ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতে তারা। জনসংখ্যার তুলনায় ফুটবলে উরুগুয়ের সাফল্য আজও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি।
এবার মার্সেলো বিয়েলসার অধীনে উরুগুয়ের লক্ষ্য আবারও বড় কিছু করা। তবে শুরুটা নিখুঁত হয়নি। প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে তারা। ফলে কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচটি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। জয় পেলে গ্রুপে অবস্থান শক্ত হবে, না হলে শেষ ম্যাচের আগে চাপ বাড়বে।
অন্যদিকে কেপ ভার্দে বিশ্বকাপে অভিষেক করছে। ছোট্ট আফ্রিকান দ্বীপদেশটি প্রথম ম্যাচেই স্পেনকে গোলশূন্য ড্রয়ে আটকে দিয়ে বড় চমক দেখিয়েছে। ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে সেই এক পয়েন্ট শুধু ফল নয়, আত্মবিশ্বাসেরও বড় উৎস। আজ উরুগুয়ের বিপক্ষে তারা আবারও প্রমাণ করতে চাইবে, তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা কোনো কাকতালীয় গল্প নয়।
কেপ ভার্দের জনসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের কিছু বেশি। কিন্তু দেশটির ফুটবল শক্তির বড় অংশ এসেছে প্রবাসী সম্প্রদায় থেকেও। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বেড়ে ওঠা কেপ ভার্দে বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়রা জাতীয় দলকে নতুন উচ্চতায় তুলেছেন। তাই ছোট জনসংখ্যা সত্ত্বেও দলটি বিশ্বকাপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো স্কোয়াড গড়তে পেরেছে।
এই ম্যাচের সম্ভাব্য রেকর্ডকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে দুই দেশের বিপরীত গল্প। উরুগুয়ে ছোট দেশ হয়েও দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কেপ ভার্দে ছোট দেশ হয়েও প্রথমবার বিশ্বকাপে এসে স্পেনের মতো দলকে থামিয়েছে। একদিকে ঐতিহ্য, অন্যদিকে নতুন স্বপ্ন। একদিকে বিশ্বকাপ ট্রফির পুরোনো মালিক, অন্যদিকে অভিষিক্ত চ্যালেঞ্জার।
গ্রুপ ‘এইচ’-এর হিসাবও ম্যাচটিকে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। স্পেন সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে হারিয়ে ৪ পয়েন্টে উঠেছে। সৌদি আরব দুই ম্যাচে ১ পয়েন্টে আছে। উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দে দুদলই একটি করে ম্যাচ খেলে ১ পয়েন্ট পেয়েছে। তাই আজকের ম্যাচে যে দল জিতবে, সে শেষ ৩২-এর পথে বড় পদক্ষেপ নেবে।
উরুগুয়ের জন্য জয় জরুরি, কারণ শেষ ম্যাচে তাদের সামনে স্পেন। বিয়েলসার দল যদি কেপ ভার্দেকে হারাতে না পারে, তাহলে স্পেন ম্যাচের আগে তাদের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যাবে। আর কেপ ভার্দে যদি আবারও পয়েন্ট নিতে পারে, তাহলে গ্রুপের শেষ রাউন্ডে তারা সত্যিকারের নকআউট দাবিদার হয়ে উঠবে।
মায়ামির ম্যাচটি তাই ইতিহাসে থাকতে পারে এক বিরল পরিসংখ্যানের জন্য। বিশ্বকাপের সবচেয়ে ছোট সম্মিলিত জনভিত্তির ম্যাচগুলোর একটিতে নামবে দুই দল। আর সেই ম্যাচেই হয়তো নির্ধারিত হতে পারে গ্রুপ ‘এইচ’-এর নকআউট পথের বড় অংশ।






