গোলখরা ভেঙে সৌদিকে উড়িয়ে দিল স্পেন

প্রথম ম্যাচের হতাশা কাটিয়ে বিশ্বকাপে জয়ের পথে ফিরল স্পেন। আটলান্টায় গ্রুপ ‘এইচ’-এর ম্যাচে সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে হারিয়েছে ইউরো চ্যাম্পিয়নরা। লামিনে ইয়ামাল করেছেন নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল, জোড়া গোল করেছেন মিকেল ওয়ারসাবাল। অন্য গোলটি এসেছে সৌদি ডিফেন্ডার হাসান আল-তামবাকতির আত্মঘাতী গোলে।
কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর প্রশ্ন উঠেছিল ইউরো চ্যাম্পিয়নদের আক্রমণ নিয়ে। আটলান্টায় সেই প্রশ্নের জবাব দিল লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। সৌদি আরবকে ৪-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ ‘এইচ’-এ ঘুরে দাঁড়াল স্পেন।
কেপ ভার্দে ম্যাচের পর স্পেনের সামনে চাপ ছিল স্পষ্ট। বলের দখল ছিল, পাস ছিল, কিন্তু গোল ছিল না। সেই ব্যর্থতা ভুলতে দে লা ফুয়েন্তে একাদশে চারটি পরিবর্তন আনেন। মার্কোস ইয়োরেন্তে, ফাবিয়ান রুইস, গাভি ও ফেরান তোরেসের জায়গায় আসেন পেদ্রো পোরো, লামিনে ইয়ামাল, দানি ওলমো ও অ্যালেক্স বায়েনা। বদলায় কাঠামোও। পেদ্রি নিচে নেমে রদ্রির পাশে খেলেন, ওলমো পান মাঝের জায়গা, আর ডান দিক দিয়ে শুরু থেকেই আগুন ধরান ইয়ামাল।
ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, এই স্পেন আগের ম্যাচের স্পেন নয়। বল দ্রুত চলছিল, পাসের গতি বেশি ছিল, দুই প্রান্তে খেলোয়াড়েরা গভীরতা দিচ্ছিলেন। সবচেয়ে বেশি নজর ছিল ইয়ামালের দিকে। চোট কাটিয়ে প্রথমবারের মতো এবারের বিশ্বকাপে শুরুর একাদশে নেমে তিনি শুরু থেকেই সৌদি রক্ষণকে ব্যস্ত রাখেন।
১০ মিনিটে আসে প্রথম গোল। ওয়ারসাবালের নিচু ক্রসে দূরের পোস্টে পৌঁছে বল জালে পাঠান ইয়ামাল। বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল করলেন ১৮ বছর বয়সী বার্সেলোনা ফরোয়ার্ড। একই সঙ্গে ভাঙল স্পেনের দীর্ঘ গোলখরা।
২০২২ বিশ্বকাপে জাপানের বিপক্ষে আলভারো মোরাতার গোলের পর বিশ্বকাপে আর গোল পায়নি স্পেন। কাতারে মরক্কোর বিপক্ষে গোলহীন ১২০ মিনিট, এবারের আসরে কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ৯০ মিনিট, এরপর সৌদি ম্যাচের প্রথম ১০ মিনিট, সব মিলিয়ে ২৯৯ মিনিট পর বিশ্বকাপে গোল পেল স্পেন। সেই অপেক্ষার শেষ হলো ইয়ামালের পায়ে।
গোলের পর থামেনি স্পেন। দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচের আগে বলেছিলেন, তাঁর খেলোয়াড়েরা আগের ম্যাচের সমালোচনায় ক্ষুব্ধ। মাঠে সেটিই দেখা গেল। ২১ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন ওয়ারসাবাল। সৌদি রক্ষণ ঠিকমতো বল সরাতে না পারায় তৈরি হওয়া সুযোগ কাজে লাগান রিয়াল সোসিয়েদাদ ফরোয়ার্ড।
তিন মিনিট পর আবার ওয়ারসাবাল। বাম দিক থেকে আক্রমণে উঠে আসা মার্ক কুকুরেয়ার বল দ্বিতীয় পোস্টে যায়। দানি ওলমোর মিস-হিট শটই কার্যত সহায়তা হয়ে যায়, আর ওয়ারসাবাল সহজে বল জালে পাঠিয়ে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন। ২৪ মিনিটের মধ্যেই ৩-০ এগিয়ে যায় স্পেন।
এই শুরুর ঝড়েই ম্যাচের ফল প্রায় নির্ধারিত হয়ে যায়। ওয়ারসাবাল নিজেও বিশেষ এক পরিসংখ্যানে ঢুকে পড়েন। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচের প্রথম ২৫ মিনিটে দুই গোল ও এক অ্যাসিস্ট করা দ্বিতীয় খেলোয়াড় তিনি। কেপ ভার্দের বিপক্ষে যাঁকে ঘিরে প্রশ্ন ছিল, সৌদি আরবের বিপক্ষে তিনিই স্পেনের আক্রমণের কেন্দ্র হয়ে ওঠেন।
ওয়ারসাবাল হ্যাটট্রিকের কাছেও গিয়েছিলেন। সৌদি গোলরক্ষক মোহাম্মদ আল-ওয়াইসের ভুল পাস থেকে পাওয়া সুযোগে তাঁর শট লাগে ক্রসবারে। পরে আরেকটি শট অল্পের জন্য বাইরে যায়। ইয়ামালও দ্বিতীয় গোলের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সৌদি রক্ষণ ও আল-ওয়াইস তাঁকে আর সুযোগ বাড়াতে দেয়নি।
প্রথমার্ধ শেষে স্পেনের স্কোর ছিল ৩-০। শুধু গোল নয়, আধিপত্যেও ছিল একতরফা ছবি। বলের দখল, শট, পাস, ফাইনাল থার্ডে উপস্থিতি, সবকিছুতেই সৌদি আরবকে পেছনে ফেলে স্পেন। সৌদি আরবের রক্ষণ বারবার দেরি করেছে, আর স্পেন সেই ফাঁকগুলো দ্রুত কাজে লাগিয়েছে।
বিরতির পর ইয়ামাল ও ওয়ারসাবালকে বিশ্রাম দেন দে লা ফুয়েন্তে। চোট কাটিয়ে ফেরা ইয়ামালের মিনিট নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন ছিল। ওয়ারসাবালও কাজ সেরে ফেলেছিলেন প্রথমার্ধেই। তাঁদের জায়গায় নামেন ইয়েরেমি পিনো ও ফেরান তোরেস।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই চতুর্থ গোল পায় স্পেন। কর্নারের পর কুকুরেয়ার জোরালো ভলি ঠেকান আল-ওয়াইস। কিন্তু বল সৌদি ডিফেন্ডার হাসান আল-তামবাকতির গায়ে লেগে জালে যায়। ৪৯ মিনিটেই স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৪-০।
এরপর ম্যাচের গতি কমে যায়। দুই দলই অনেকটা নিয়ন্ত্রিত ফুটবল খেলতে থাকে। স্পেন বল ধরে রাখে, সৌদি আরব চেষ্টা করে অন্তত একটি গোল শোধ করার। কিন্তু উনাই সিমোনকে খুব বেশি পরীক্ষা দিতে পারেনি তারা। ৮০ মিনিটে আল হামদানের শট নিরাপদে ধরে ফেলেন স্পেন গোলরক্ষক।
স্পেনের পক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে আরও গোল হতে পারত। ফেরান তোরেস কয়েকটি সুযোগ নষ্ট করেন। শেষ দিকে তাঁর একটি গোল ভিএআর দেখে বাতিল হয় অফসাইডের কারণে। মিকেল মেরিনো ও নিকো উইলিয়ামস নামার পরও স্পেন আক্রমণে জায়গা পেয়েছে, কিন্তু প্রথমার্ধের ধার আর ততটা ছিল না। তখন ম্যাচের ফল নিয়ে কোনো সংশয়ও ছিল না।






