স্পেন-মরক্কোর টানাটানি পেরিয়ে বিশ্বকাপে ইয়ামাল

একটি কিশোর প্রতিভাকে নিয়ে দুই দেশের টানাটানি। একদিকে স্পেন, অন্যদিকে মরক্কো। বয়স তখন মাত্র ১৬। কিন্তু স্পেনের তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে সিদ্ধান্তটা ছিল সাধারণ কোনো যুব ফুটবলারের জাতীয় দল বেছে নেওয়ার গল্প নয়। স্পেনের জন্য সেটি ছিল ভবিষ্যতের এক বড় প্রতিভাকে ধরে রাখার প্রশ্ন। মরক্কোর জন্য ছিল বিশ্বমানের এক সম্ভাবনাকে নিজেদের প্রকল্পে টেনে নেওয়ার সুযোগ।
আজ সেই ইয়ামাল বিশ্বকাপে স্পেনের অন্যতম বড় মুখ। কিন্তু গল্পটা শুরু হয়েছিল আরও আগে। ২০১৯ সালের জুনে নিউইয়র্কে লা লিগা প্রমিসেস ইন্টারন্যাশনাল টুর্নামেন্টে বার্সেলোনার হয়ে আলো ছড়ান এক কিশোর। সবার নজর ছিল প্যাট্রিক ক্লাইভার্টের ছেলে শেন ক্লাইভার্টের দিকে। কিন্তু টুর্নামেন্ট শেষে আলো নিজের দিকে টেনে নেন লামিনে ইয়ামাল। সেই আসরে ৭ গোল করে তিনি জানান দিয়েছিলেন, বার্সেলোনার একাডেমিতে আরেকটি বিশেষ প্রতিভা বেড়ে উঠছে।
চার বছর পর সেই প্রতিভাকেই ঘিরে তৈরি হয় স্পেন-মরক্কোর লড়াই। ইয়ামালের জন্ম স্পেনে। তার বাবা মরক্কোর, মা ইকুয়াটোরিয়াল গিনির। তাই আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার সামনে ছিল একাধিক পথ। মরক্কো তখন ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলা দল, আফ্রিকান ফুটবলের নতুন শক্তি। তারা ইয়ামাল ও তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করছিল নিজেদের পরিকল্পনা বোঝাতে।
স্পেনও বুঝেছিল, সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। ২০২৩ সালের আগস্টে স্পেন ফুটবল ফেডারেশনের তিতো ব্লাঙ্কো ও ফ্রান্সিস হার্নান্দেজ বার্সেলোনায় গিয়ে ইয়ামাল ও তার ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের বার্তা ছিল পরিষ্কার, ইয়ামাল চাইলে লুইস দে লা ফুয়েন্তের পরের স্কোয়াডে থাকতে পারেন।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, মরক্কোও একই সময়ে সক্রিয় ছিল। ইয়ামালকে শুধু একজন ফুটবলার হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবেও দেখছিল তারা। ২০৩০ বিশ্বকাপের যৌথ আয়োজক হওয়ার স্বপ্ন, ২০২২ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালের পর নতুন আত্মবিশ্বাস এবং ইউরোপে জন্ম নেওয়া মরক্কান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের জাতীয় প্রকল্পে যুক্ত করার নীতি, সব মিলিয়ে ইয়ামালকে ঘিরে আগ্রহ ছিল প্রবল।
মরক্কোর এই চেষ্টা ভুল ছিল না। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দ্বৈত বা বহুজাতিক পরিচয়ের খেলোয়াড়দের নিয়ে এমন প্রতিযোগিতা এখন খুব সাধারণ। পরিবার, জন্মস্থান, শিকড়, ফুটবলীয় সুযোগ, আবেগ, সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হয় খেলোয়াড়কেই। ইয়ামালের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। পার্থক্য হলো, তার বয়স ছিল মাত্র ১৬, অথচ তার সিদ্ধান্ত নিয়ে দুই দেশের ফুটবল প্রশাসনের আগ্রহ ছিল বিরাট।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল ইয়ামালের প্রতিক্রিয়া। স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের স্মৃতিতে, খবরটি শুনে তার পরিবার যতটা উদ্বিগ্ন ছিল, ইয়ামাল নিজে ততটাই শান্ত। এত কম বয়সে এমন বড় সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়েও তিনি অস্থির হননি। বরং স্বাভাবিক ছিলেন। এই মানসিক দৃঢ়তাই পরে তার খেলায়ও দেখা গেছে, ভয়হীন ড্রিবল, একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত, এবং বড় ম্যাচেও স্বাভাবিক থাকা।
স্পেনের সিদ্ধান্ত ছিল শুধু ফুটবলীয় নয়, মানসিকও। ১৬ বছর বয়সী একজন খেলোয়াড়কে সরাসরি জাতীয় দলের আলোয় আনা ঝুঁকির। খুব দ্রুত চাপ দিলে প্রতিভা ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারে। কিন্তু ইয়ামালকে যারা কাছ থেকে দেখেছিলেন, তাদের ধারণা ছিল, তিনি বয়সের তুলনায় অনেক বেশি পরিণত। তাই তাকে এগিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেই সিদ্ধান্ত ভুল হয়নি। ২০২৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জর্জিয়ার বিপক্ষে স্পেনের হয়ে অভিষেক করেন ইয়ামাল। তখন তার বয়স ১৬ বছর ৫৭ দিন। সেই ম্যাচে তিনি শুধু স্পেনের সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়ই হননি, গোল করে হন স্পেনের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতাও। এক রাতেই তিনি জাতীয় দলের ইতিহাসে ঢুকে পড়েন।
এরপর ইউরো ২০২৪-এ তার রেকর্ডের তালিকা আরও বড় হয়। তিনি হন ইউরোর ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড়, সর্বকনিষ্ঠ অ্যাসিস্টদাতা ও সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা। স্পেন ইউরো জেতে, আর ইয়ামাল হয়ে ওঠেন সেই দলের সবচেয়ে আলোচিত মুখগুলোর একটি।
ইয়ামালকে ঘিরে মেসির তুলনা নতুন নয়। বার্সেলোনা একাডেমি, বাঁ পা, ডান দিক থেকে ভিতরে ঢোকা, বল পায়ে অস্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ, সব মিলিয়ে তুলনাটা খুব সহজেই চলে আসে। তবে এখানেই সতর্কতার জায়গা আছে।
স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে বলেছেন, ইয়ামালকে মেসি বা ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করাই সবচেয়ে বড় ভুল হতে পারে। তার মতে, ইয়ামালকে নিজের পথ তৈরি করতে দিতে হবে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইয়ামালকে এমন প্রতিভা বলেছেন, যাঁদের কাজ সাধারণ চোখে অবিশ্বাস্য মনে হলেও তাদের কাছে তা স্বাভাবিক। দে লা ফুয়েন্তে এমন প্রতিভার উদাহরণ হিসেবে দালি ও মাইকেলেঞ্জেলোর নামও টেনেছেন।
এবারের বিশ্বকাপে ইয়ামাল এসেছেন চোট কাটিয়ে। স্পেনের প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের বিপক্ষে তিনি বদলি হিসেবে ফিরেছেন। সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচের আগে তাকে নিয়ে আবারও আলোচনা, তিনি শুরু করবেন কি না, কত মিনিট খেলতে পারবেন, পুরো ফিট কি না। দে লা ফুয়েন্তে অবশ্য বলেছেন, ইয়ামাল ভালো অবস্থায় আছেন। তবে দীর্ঘ চোটের পর তাকে কতটা ঝুঁকি নিয়ে খেলানো হবে, সেটিও স্পেনের জন্য বড় প্রশ্ন।
স্পেনের জন্য ইয়ামাল এখন শুধু প্রতিভা নয়, কৌশলগত অস্ত্র। দে লা ফুয়েন্তের দল বলের দখল রাখতে পারে, পাসিং ফুটবল খেলতে পারে, কিন্তু ইয়ামাল ও নিকো উইলিয়ামসের মতো খেলোয়াড়ই তাদের এক-এক লড়াই জেতার ক্ষমতা দেয়। কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্রয়ের পর স্পেন বুঝেছে, শুধু পজেশন যথেষ্ট নয়। দরকার এমন কেউ, যে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে পারে।
মরক্কোর দৃষ্টিকোণ থেকেও ইয়ামালের গল্প শেষ হয়নি। তিনি স্পেনকে বেছে নিয়েছেন, কিন্তু তার পরিচয়ের একটি অংশ মরক্কোর সঙ্গে জড়িত। বিশ্বকাপের মঞ্চে স্পেন ও মরক্কো যদি কখনো মুখোমুখি হয়, ইয়ামালকে ঘিরে সেই আবেগ আবার আলোচনায় আসবেই। মরক্কোর ফুটবল প্রশাসনের কেউ কেউ এখনো তার সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করেন। সেটিও দেখায়, ইয়ামাল কত বড় প্রতিভা হিসেবে দেখা হয়েছিল।
১৮ বছর বয়সী ইয়ামাল এখন নিজের প্রথম বিশ্বকাপে। ইউরো জেতা হয়ে গেছে, জাতীয় দলের রেকর্ড গড়া হয়ে গেছে, বার্সেলোনার বড় তারকা হওয়া হয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্বকাপ আলাদা। এখানে একটি ভালো ম্যাচ একজন খেলোয়াড়কে আরও বড় মঞ্চে তুলে দেয়, আবার একটি খারাপ ম্যাচ চাপও বাড়িয়ে দেয়।
ইয়ামালের বড় শক্তি হলো, তিনি যেন চাপকে স্বাভাবিক করে ফেলেছেন। ছোটবেলা থেকেই নজরে থাকা, খুব অল্প বয়সে বার্সেলোনার আলোয় আসা, জাতীয় দল নিয়ে দুই দেশের টানাটানি, ইউরোর রেকর্ড, সবকিছুর মধ্যেও তার খেলার ধরন বদলায়নি। বল পেলে এখনো তিনি ডিফেন্ডারের দিকে তাকান, পেছনে ফেরেন না।
তাই লামিনে ইয়ামালের গল্প শুধু এক বিরল প্রতিভার গল্প নয়। এটি আধুনিক ফুটবলের জাতীয় পরিচয়, একাডেমি প্রতিভা, দ্রুত পরিণত হওয়া এবং বৈশ্বিক নজরের গল্প। যে ছেলেটিকে নিয়ে একসময় স্পেন ও মরক্কো নিজেদের ভবিষ্যৎ ভেবেছিল, সেই ইয়ামাল এখন বিশ্বকাপে স্পেনের বর্তমানেরও অংশ।
স্পেন তাকে পেয়েছে। মরক্কো হারিয়েছে। আর ফুটবল পেয়েছে এমন এক কিশোর প্রতিভা, যার ওপর রেকর্ড, প্রত্যাশা ও তুলনার পাহাড় চাপলেও সে এখনো নিজের মতো বল পায়ে নিয়ে এগিয়ে যায়। এই কারণেই ইয়ামাল শুধু একজন খেলোয়াড় নন; তিনি একসময় স্পেন-মরক্কোর ফুটবল রাজনীতির বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছিলেন।






