৩৩ ম্যাচে ১০০ গোল, কেন এত গোলের বিশ্বকাপ

২০২৬ বিশ্বকাপ যেন গোলের বিশ্বকাপ। মাত্র ৩৩ ম্যাচেই গোলসংখ্যা ছুঁয়েছে ১০০। গত ৬৮ বছরে কোনো বিশ্বকাপে এত দ্রুত তিন অঙ্কে পৌঁছায়নি গোলের হিসাব। নেদারল্যান্ডসের সুইডেনকে ৫-১ গোলে হারানোর ম্যাচে কোডি গাকপোর গোলেই আসে এই মাইলফলক।
এর আগে এত দ্রুত ১০০ গোল দেখা গিয়েছিল ১৯৫৮ বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর চেয়ে দ্রুত ১০০ গোল হয়েছিল শুধু ১৯৫৪ সালে, সুইজারল্যান্ডে হওয়া আসরে। সে আসরে ২০ ম্যাচেই তিন অঙ্কে পৌঁছেছিল গোলের সংখ্যা। ২০১৪ বিশ্বকাপে ১০০ গোল হতে লেগেছিল ৩৬ ম্যাচ, ১৯৯৪ ও ১৯৭৮ বিশ্বকাপে লেগেছিল ৩৮ ম্যাচ। সেই তুলনায় ২০২৬ আসর অনেক দ্রুত এগোচ্ছে।
এবারের বিশ্বকাপে গোলের গড়ও চোখে পড়ার মতো। প্রথম ৩৩ ম্যাচের হিসাবে ম্যাচপ্রতি গোল ৩-এর বেশি। এই গতি চলতে থাকলে ১০৪ ম্যাচের আসরে মোট গোল ৩০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। প্রশ্ন হলো, হঠাৎ এত গোল কেন? শুধু আক্রমণাত্মক ফুটবল, নাকি এর পেছনে বল, ফরম্যাট, গরম, বিরতি ও তারকাদের ফর্ম, সব মিলিয়ে বড় ভূমিকা রাখছে?
প্রথম আলোচনায় আসছে বল। ২০২৬ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল অ্যাডিডাস ট্রিওন্ডা। ফিফা জানিয়েছে, তিন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডাকে মাথায় রেখে এই বলের নকশা করা হয়েছে। বলটির নতুন চার-প্যানেল নির্মাণও আলোচনায় আছে। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি দূরপাল্লার গোল হয়েছে, আর কয়েকজন সাবেক গোলরক্ষক বলের গতিপথ ও গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
ফ্রান্সের হয়ে কিলিয়ান এমবাপ্পের দূরপাল্লার গোল, লিওনেল মেসির শট, ইংল্যান্ড-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে মার্টিন বাতুরিনার গোল, সুইডেনের ইয়াসিন আয়ারির দূরপাল্লার গোল, সব মিলিয়ে দূর থেকে শট নেওয়ার প্রবণতা চোখে পড়েছে। শুধু সরাসরি লং-রেঞ্জ গোল নয়, কয়েকটি গোল এসেছে গোলরক্ষকের হাত ফসকে যাওয়া বা বলের গতিপথ ঠিকমতো পড়তে না পারার পরও।
বিশ্বকাপের বল নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে জাবুলানি বলের বাঁক, ডিপ ও অস্বাভাবিক গতিপথ নিয়ে অনেক গোলরক্ষক অভিযোগ করেছিলেন। ট্রিওন্ডা সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, তা এখনই বলা কঠিন। তবে গোলরক্ষকেরা যে বলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে আলোচনায় আছেন, সেটি স্পষ্ট।
দ্বিতীয় কারণ হতে পারে বিশ্বকাপের নতুন ফরম্যাট। এবার প্রথমবারের মতো ৪৮ দল খেলছে। মোট ম্যাচ ১০৪টি। ১২টি গ্রুপ, প্রতিটি গ্রুপে ৪ দল। সেরা দুই দল সরাসরি শেষ ৩২-এ যাবে, সঙ্গে যাবে সেরা আট তৃতীয় দল। ফলে দলসংখ্যা বাড়ায় তুলনামূলক কম র্যাঙ্কিংয়ের দলও বিশ্বকাপে এসেছে।
এই বিস্তৃত ফরম্যাটে ব্যবধান কিছু ম্যাচে স্পষ্ট হয়েছে। জার্মানি ৭-১ গোলে হারিয়েছে কুরাসাওকে, কানাডা ৬-০ গোলে হারিয়েছে কাতারকে, নেদারল্যান্ডস ৫-১ গোলে হারিয়েছে সুইডেনকে, জাপান ৪-০ গোলে হারিয়েছে তিউনিসিয়াকে। তবে এটাও ঠিক, সব নতুন বা কম শক্তির দল ভেঙে পড়েনি। কেপ ভার্দে স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে চমক দেখিয়েছে। তাই শুধু দল বাড়ানোই গোলবন্যার একমাত্র কারণ নয়।
তৃতীয় কারণ হতে পারে গরম, ভ্রমণ ও ক্লান্তি। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় গ্রীষ্মে হচ্ছে এই বিশ্বকাপ। কাতার বিশ্বকাপ হয়েছিল শীতকালে, যাতে মধ্যপ্রাচ্যের গরম এড়ানো যায়। এবার অনেক ম্যাচেই তাপমাত্রা, আর্দ্রতা ও ভ্রমণ খেলোয়াড়দের জন্য বড় পরীক্ষা। ম্যাচের শেষ ভাগে রক্ষণভাগের মনোযোগ ধরে রাখাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
দীর্ঘ ভ্রমণ, ভিন্ন টাইম জোন, গরম এবং দ্রুত পুনরুদ্ধার, সব মিলিয়ে দলগুলোর রক্ষণে চাপ বাড়ছে। ছোট ভুল থেকেও গোল হচ্ছে। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত অনেক গোল এসেছে ভুল পাস, বিপজ্জনক জায়গায় বল হারানো অথবা ক্লান্ত রক্ষণের দেরি করা সিদ্ধান্ত থেকে। তিউনিসিয়া, কুরাসাও, কাতার, কয়েকটি দলের রক্ষণ শেষ ভাগে ভেঙে পড়েছে।
চতুর্থ কারণ হাইড্রেশন ব্রেক। গরম ও খেলোয়াড়দের সুস্থতার কথা মাথায় রেখে প্রতি অর্ধে তিন মিনিটের বাধ্যতামূলক বিরতি রাখা হয়েছে। কাগজে এটি খেলোয়াড়দের পানি পানের জন্য, কিন্তু বাস্তবে কোচরা এই সময়কে ছোট ট্যাকটিকাল টাইমআউট হিসেবেও ব্যবহার করতে পারছেন। তিন মিনিটে বোর্ডে ছবি দেখানো, আক্রমণের পথ বদলানো, প্রেসিং ট্রিগার বোঝানো বা পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া, সবই করা যাচ্ছে।
এই বিরতি ম্যাচের ছন্দ ভাঙছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ বলছেন, এতে ফুটবলের স্বাভাবিক প্রবাহ নষ্ট হচ্ছে। আবার কেউ মনে করছেন, এই বিরতিতে কোচরা দ্রুত ভুল সংশোধন করতে পারছেন। ফলে ম্যাচের মাঝপথেই কৌশল বদলানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে, যা কখনো কখনো আক্রমণকে আরও কার্যকর করতে পারে।
পঞ্চম কারণ বড় তারকাদের ফর্ম। অনেক বিশ্বকাপে দেখা যায়, মৌসুম শেষে ক্লান্ত তারকারা পুরো ফিট না থাকায় শুরুতে ছন্দ খুঁজে পান না। কিন্তু এবার ছবিটা আলাদা। লিওনেল মেসি আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেছেন। কিলিয়ান এমবাপ্পে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করেছেন। আর্লিং হলান্ড ইরাকের বিপক্ষে দুই গোল করেছেন। হ্যারি কেইন ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে গোল করেছেন। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও ব্রাজিলের দুই ম্যাচেই গোল পেয়েছেন।
অর্থাৎ শুধু দুর্বল রক্ষণ নয়, আক্রমণভাগের বড় নামগুলোও দারুণ ছন্দে আছে। বিশ্বকাপের চাপ তাদের আটকে দেয়নি, বরং তারা শুরু থেকেই গোলের ক্ষুধা দেখিয়েছে। এটাই গোলের সংখ্যা বাড়ার বড় কারণ। বড় দলগুলো অনেক সময় গ্রুপ পর্বের শুরুতে সাবধানী থাকে। এবার তারা দ্রুত ম্যাচ মেরে দেওয়ার চেষ্টা করছে।
নতুন ফরম্যাটও এতে প্রভাব ফেলছে। সেরা তৃতীয় দলের সুযোগ থাকলেও গোল ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। বড় দলগুলো তাই শুধু জয় নয়, বড় ব্যবধানও চাইছে। আবার ছোট দলগুলো পিছিয়ে পড়লে ঝুঁকি নিচ্ছে, কারণ এক পয়েন্টের চেয়ে জয়ের দরকার বেশি। ফলে ম্যাচ খুলে যাচ্ছে, পাল্টা আক্রমণের সুযোগ বাড়ছে, গোলও বাড়ছে।
গোলবন্যার মধ্যে আরেকটি বিষয় হলো ম্যাচের চরিত্র। এখন অনেক দল সাবধানী ফুটবল খেলতে চায়, এমনকি তুলনামূলক ছোট দলও পেছন থেকে পাস দিয়ে উঠতে চায়। কিন্তু উচ্চ প্রেসিংয়ের মুখে ভুল হলে গোলের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, কানাডা, সুইডেন, ফ্রান্স, অনেক দলই প্রতিপক্ষের ভুল থেকে দ্রুত আক্রমণে গোল পেয়েছে।
তবে এই গোলের উৎস একরকম নয়। কোথাও বলের গতি গোলরক্ষককে বিপদে ফেলছে, কোথাও ফরম্যাটের ব্যবধান বড় স্কোরলাইন তৈরি করছে, কোথাও গরমে শেষ ভাগে রক্ষণ ভাঙছে, কোথাও হাইড্রেশন ব্রেকের পর কৌশল বদলে গোল আসছে, আবার কোথাও মেসি-এমবাপ্পে-হলান্ডদের মতো তারকারা নিজেদের মান দেখাচ্ছেন।
তাই ২০২৬ বিশ্বকাপে গোল বেশি হওয়ার একক ব্যাখ্যা নেই। এটি একাধিক পরিবর্তনের সম্মিলিত ফল। নতুন বল, নতুন ফরম্যাট, নতুন বিরতি, উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্ম এবং আক্রমণাত্মক তারকাদের ফর্ম, সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ এবার গোলের উৎসবে পরিণত হয়েছে।
এই গতি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে কি না, সেটিই এখন দেখার। গ্রুপ পর্বের শেষ রাউন্ডে অনেক ম্যাচ আরও হিসাবি হতে পারে। নকআউটে দলগুলো ঝুঁকি কমাতে পারে। তবু শুরুটা যেভাবে হয়েছে, তাতে ২০২৬ বিশ্বকাপ ইতিমধ্যেই গোলের ইতিহাসে আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। ৩৩ ম্যাচে ১০০ গোল শুধু পরিসংখ্যান নয়, এটি বলছে, এই বিশ্বকাপ আগের অনেক আসরের চেয়ে বেশি খোলা, বেশি দ্রুত এবং অনেক বেশি গোলমুখী।






