ফের ঘরবাড়ি-ফসলি জমি গিলে খাচ্ছে যমুনা

এশিয়া পোস্ট নিউজ, সিরাজগঞ্জ
ফের ঘরবাড়ি-ফসলি জমি গিলে খাচ্ছে যমুনা
যমুনার পাড়ে বসে নদীভাঙনের দৃশ্য দেখছেন ক্ষতিগ্রস্ত এক বৃদ্ধা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর তীব্র স্রোতে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদী আবারও তার ভয়াল রূপে ফিরে এসেছে। জেলার চৌহালী, কাজিপুর, শাহজাদপুর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী জনপদে শুরু হয়েছে তীব্র নদীভাঙন। প্রতিদিন নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা ও মানুষের জীবনভর গড়া স্বপ্ন।

Advertisement

পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও বাড়ছে ভাঙনের তীব্রতা

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে যমুনার পানি দ্রুত বাড়লেও এখনও তা বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। তবে পানি ওঠানামার কারণে ভাঙনের তীব্রতা বহুগুণ বেড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধ হার্ডপয়েন্টে ১৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২২৮ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে, কাজিপুর উপজেলার মেঘাই ঘাট পয়েন্টেও গত ২৪ ঘণ্টায় ১৯ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে বিপৎসীমার ২৮১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে বসতভিটা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েকদিনে চৌহালী উপজেলার চর সলিমাবাদ পয়েন্টে এরইমধ্যে প্রায় ১২০ মিটার এলাকা এবং সিরাজগঞ্জ সদরে রতনকান্দি ইউনিয়নে নদীর তীররক্ষা বাঁধের ৩০ মিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ (বালুভর্তি বিশেষ ব্যাগ) ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

নিঃস্ব হচ্ছে শত শত পরিবার, ঝুঁকিতে হাট-বাজার ও স্কুল

জানা গেছে, চৌহালীর খাস কাউলিয়া ইউনিয়নের ভূতের মোড়, বাঘুটিয়া ইউনিয়নের বিনানুই, রেহাই পুখুরিয়া, দেওয়ানগঞ্জ বাজার ও চর সলিমাবাদসহ বিভিন্ন এলাকায় চলতি ভাঙনে কোথাও কোথাও কয়েকশ ফুট এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। এক মাস আগেই চৌহালীর অন্তত ছয় থেকে সাতটি গ্রামের বহু পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে।

চর সলিমাবাদ এলাকার ইউপি সদস্য আব্দুস সালাম জানান, এক মাস আগে তার এলাকায় ৩০টিরও বেশি বাড়ি-ঘর নদীতে বিলীন হয়েছে। এছাড়া বাঘুটিয়া ইউনিয়নের সম্ভুদিয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় সম্প্রতি প্রায় ৩০০ মিটার ভূমি একসঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় খাসপুখুরিয়া ও বাঘুটিয়া ইউনিয়নের শত শত পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও কৃষিজমি এখন চরম হুমকির মুখে।

চরকানালিয়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মানিক জানান, বারবার ঘর করেছি, বারবার নদী নিয়ে গেছে। বাপ-দাদার ৫০ বিঘা জমির মালিক ছিলাম, এখন হাতে আছে মাত্র কয়েক শতাংশ জমি। আমরা আর কিছু চাই না, শুধু একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ চাই।

চর সলিমাবাদের গৃহবধূ বিলকিস বলেন, আমরা কাজ করে খেতে পারি, কিন্তু নদীর ভাঙন থামাতে পারি না। একটা স্থায়ী বাঁধ হলে অন্তত সন্তানদের নিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারতাম।

একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা। ছবি: এশিয়া পোস্ট
একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে বসতভিটা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

৬০ বছর বয়সী সাবিয়া বেগম কয়েক বছর আগেই হারিয়েছেন নিজের বসতভিটা। নদীর ভাঙন তার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে নিরাপত্তা ও শান্তি। তিনি বলেন, আমাদের গ্রাম, বাড়িঘর, জমিজমা সব নদী গিলে খাচ্ছে। ভাঙনের চিন্তায় রাতে ঘুমাতে পারি না।

ভূমিহীন চৌহালীর চর সলিমাবাদ গ্রামের অটোরিকশাচালক মোল্লা সাইফুল ইসলামের একমাত্র সম্বল ছিল ছোট্ট একটি বসতঘর। কিন্তু গত ৪ জুন রাতে সেই আশ্রয়টুকুও যমুনার ভয়াল ভাঙনে কেড়ে নিয়েছে।

চরাঞ্চলে স্থায়ী বাঁধের পরিকল্পনা নেই পাউবোর

শুধু চৌহালী নয়, সিরাজগঞ্জ সদর, কাজিপুর উপজেলার খাস রাজবাড়ী, নাটুয়ারপাড়া, সদর উপজেলার কাওয়াকোলা চর এবং শাহজাদপুরের গালা ও সনাতনী ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামেও নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে।

কাওয়াকোলা চরের কৃষক বাদশা শেখ বলেন, সারা বছর কষ্ট করে চাষাবাদ করি, কিন্তু নদী এক মুহূর্তে সবকিছু কেড়ে নেয়। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা, পরিবার নিয়ে আগামী দিনে কোথায় আশ্রয় নেব।

নাটুয়ারপাড়ার কৃষক সেরু শেখ, আব্দুল কাদের ও সামছুল শেখ বলেন, যমুনার পানি বাড়া-কমার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের দুশ্চিন্তাও বাড়ছে। বছরের পর বছর ফসলি জমি, বসতভিটা ও গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। স্থায়ী কোনো সমাধান না থাকায় দুর্ভোগ কমছে না।

নদীভাঙনের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে ভাঙন ঠেকাতে জিওব্যাগ ফেলে জরুরি আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে চরাঞ্চলের ভেতরের অংশগুলোতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের আপাতত কোনো সরকারি পরিকল্পনা নেই।