বিশ্বকাপের মাঠের বাইরের লড়াইয়ে অ্যাডিডাস নাকি নাইকি, কে এগিয়ে

চলছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ। লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা আর্লিং হলান্ডরা যখন মাঠে ফুটবলের গল্প লিখছেন, ঠিক তখনই মাঠের বাইরে চলছে আরেক লড়াই। সেই লড়াই বিশ্বের দুই বড় ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নাইকি ও অ্যাডিডাসের।
এই লড়াই শুধু লোগো দেখানোর নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জার্সি বিক্রি, জুতা, বল, বিজ্ঞাপন, তারকা-প্রভাব, তরুণ প্রজন্মের পছন্দ এবং কোটি কোটি সমর্থকের আবেগ। বিশ্বকাপ এখন শুধু মাঠের খেলা নয়, এটি ফুটবল সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণেরও বড় মঞ্চ।
নাইকির ‘রিপ দ্য স্ক্রিপ্ট’ আর অ্যাডিডাসের ‘ব্যাকইয়ার্ড লিজেন্ডস’ দুই প্রচারণার পেছনেই আছে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ। উত্তর আমেরিকায় বিশ্বকাপ হওয়ায় নাইকির জন্য এটি অনেকটা নিজের অঞ্চলের আসর। কিন্তু সেই মঞ্চেই নিজেদের উপস্থিতি আরও বড় করে তুলতে মরিয়া জার্মান প্রতিষ্ঠান অ্যাডিডাস।
এবারের বিশ্বকাপ সামনে রেখে দুই প্রতিষ্ঠানই প্রচলিত বিজ্ঞাপনের বাইরে গিয়ে বড় বাজেটের চলচ্চিত্রধর্মী বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরি করেছে। নাইকির ‘রিপ দ্য স্ক্রিপ্ট’ বিজ্ঞাপনে এমবাপ্পে, হলান্ড, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, ভিনিসিয়ুস জুনিয়রদের মতো ফুটবল তারকারা আছেন। ফুটবলের বাইরে বাস্কেটবল কিংবদন্তি লেব্রন জেমসও সেখানে বড় চমক। বিজ্ঞাপনটির মূল সুর হলো ফুটবলের অনিশ্চয়তা, নাটকীয়তা ও তারকা-আবেগ।
It was all going to plan until instincts took over…
— Nike (@Nike) June 4, 2026
Rip The Script pic.twitter.com/la43icZaAu
পিছিয়ে নেই অ্যাডিডাসও। তাদের ‘ব্যাকইয়ার্ড লিজেন্ডস’-এ আছেন লিওনেল মেসি, জুড বেলিংহ্যাম, লামিনে ইয়ামাল, ট্রিনিটি রডম্যান, জিনেদিন জিদান, ডেভিড বেকহ্যাম, আলেসান্দ্রো দেল পিয়েরো এবং অভিনেতা টিমোথি শ্যালামে। বিজ্ঞাপনটি পাড়ার ফুটবল, স্মৃতি, কিংবদন্তি আর বিশ্বকাপের আবহকে একসঙ্গে ধরতে চেয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাডিডাসের এই বিজ্ঞাপনচিত্র তৈরিতে প্রায় ৫ কোটি পাউন্ডের মতো খরচ হয়েছে। নাইকি তাদের খরচ প্রকাশ করেনি, তবে তাদের তারকাবহুল বিজ্ঞাপনটিও কয়েক কোটি ডলারের প্রকল্প বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।
অনলাইন দর্শকসংখ্যায় এখন পর্যন্ত নাইকি স্পষ্টভাবে এগিয়ে। বিবিসির হিসাবে, নাইকির ‘রিপ দ্য স্ক্রিপ্ট’ বিজ্ঞাপন ইউটিউবে ৭ কোটি ৬০ লাখের বেশি দেখা হয়েছে। অন্যদিকে অ্যাডিডাসের ‘ব্যাকইয়ার্ড লিজেন্ডস’ ছিল প্রায় ৭০ লাখের ঘরে। তবে শুধু অনলাইন দেখা দিয়ে এই লড়াইয়ের পূর্ণ চিত্র বোঝা যায় না।
Adidas has released a short film ‘BACKYARD LEGENDS’ for the World Cup.
— DiscussingFilm (@DiscussingFilm) May 7, 2026
Starring Timothée Chalamet, Bad Bunny, Lionel Messi and Lamine Yamal. pic.twitter.com/XOEzdgmLu6
নাইকি তাদের প্রচারণাকে শুধু বিজ্ঞাপন হিসেবে দেখাতে চায় না। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য, তারা এমন এক ফুটবল-জগৎ তৈরি করতে চায়, যা অনলাইন ও বাস্তব জীবনে সমানভাবে প্রভাব ফেলে। তারকা, গল্প, পণ্য আর সমর্থকের আবেগ—সব মিলিয়ে ফুটবলকে তারা আবার নিজেদের ব্র্যান্ডের কেন্দ্রে আনতে চাইছে।
কিন্তু রাস্তায়, দোকানে ও বিশ্বকাপের দৃশ্যমানতায় অ্যাডিডাসও শক্ত অবস্থানে। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের সোহো এলাকায় নাইকি ও অ্যাডিডাসের বড় দোকানগুলো কাছাকাছি। সেখানে অ্যাডিডাস নিজেদের দোকান বিশ্বকাপের রঙে সাজিয়েছে। জানালায় জার্সি, বল ও ফুটবল সামগ্রীর উপস্থিতি স্পষ্ট। বিপরীতে নাইকি অনেক জায়গায় এখনো বাস্কেটবল ও স্থানীয় ক্রীড়া-আবহ ধরে রেখেছে। ফলে নিউইয়র্কের রাস্তায় অ্যাডিডাসের বিশ্বকাপ-উপস্থিতি অনেকের চোখে বেশি পড়ছে।
বিশ্বকাপের মাঠে কোন প্রতিষ্ঠান কতটা দৃশ্যমান, তা বোঝার আরেকটি বড় মাপকাঠি হলো জাতীয় দলের জার্সি। এবারের বিশ্বকাপে ১৪টি দলের জার্সি সরবরাহ করছে অ্যাডিডাস। নাইকির জার্সি পরছে ১২টি দল। পুমা ১১টি দল নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে। বাকি দলগুলোর জার্সি তৈরি করছে নিউ ব্যালেন্স, কেলমে, আমব্রো, কাপ্পা, রিবকসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।
এখানেই অ্যাডিডাসের সবচেয়ে বড় সুবিধা। ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপের অফিশিয়াল বল সরবরাহ করে আসছে অ্যাডিডাস। ফিফার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক পাঁচ দশকের বেশি পুরোনো। ফলে বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচে, প্রতিটি গোলের মুহূর্তে, প্রতিটি রিপ্লেতে অ্যাডিডাসের উপস্থিতি কোনো না কোনোভাবে দেখা যায়।
অ্যাডিডাসের এবারের অবস্থান তাই দ্বিমুখী। একদিকে তারা ফিফার দীর্ঘদিনের সঙ্গী এবং অফিশিয়াল বল সরবরাহকারী, অন্যদিকে ১৪টি জাতীয় দলের জার্সি সরবরাহ করছে। ফলে মাঠে ও মাঠের বাইরে তাদের দৃশ্যমানতা শক্তিশালী।
নাইকি অবশ্য আয়ে ও বিশ্ববাজারে এখনও বড় শক্তি। ২০২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির আয় ছিল ৪ হাজার ৬৩০ কোটি ডলার। বিপরীতে ২০২৫ সালে অ্যাডিডাসের বিক্রি ছিল ২ হাজার ৪৮১ কোটি ইউরো। অর্থাৎ ব্যবসার আকারে নাইকি এখনও বড়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়টা তাদের জন্য সহজ নয়। বিক্রি কমা, শেয়ারদরের চাপ, প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠানের উত্থান এবং পুনর্গঠনের চাপে আছে প্রতিষ্ঠানটি।
নাইকির প্রধান নির্বাহী এলিয়ট হিল প্রতিষ্ঠানকে আবার ক্রীড়াকেন্দ্রিক পরিচয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন। এরই অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি ফুটবল, দৌড়, বাস্কেটবলসহ মূল ক্রীড়া বিভাগগুলোকে নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে। সম্প্রতি নাইকি প্রায় ১,৪০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে, যা তাদের পুনর্গঠন-প্রক্রিয়ার অংশ।
অন্যদিকে অ্যাডিডাস সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে বড় সাফল্য পেয়েছে। ‘রেপট্র্যাক’ ২০২৬ সালের বিশ্বস্ত ব্র্যান্ডের তালিকায় অ্যাডিডাসকে দ্বিতীয় স্থানে রেখেছে। একই তালিকায় নাইকি আছে ৫০ নম্বরে। অর্থাৎ আকারে নাইকি বড় হলেও ভোক্তার আস্থার জায়গায় অ্যাডিডাস এখন শক্ত বার্তা দিচ্ছে।
ফুটবল জার্সিও এখন শুধু খেলার পোশাক নয়। এটি ফ্যাশন, পরিচয়, স্মৃতি ও সংস্কৃতির অংশ। তরুণ প্রজন্ম প্রিয় দল বা খেলোয়াড়ের জার্সিতে শুধু সমর্থন নয়, নিজের রুচিও প্রকাশ করে। জুড বেলিংহ্যাম, লামিনে ইয়ামাল, মেসি, এমবাপ্পে বা ভিনিসিয়ুসদের মতো তারকারা তাই শুধু ফুটবলার নন, তাঁরা ফ্যাশন ও সংস্কৃতিরও প্রভাবশালী মুখ।
অ্যাডিডাসের কিছু জার্সি এবার বিশেষ নজর কাড়ছে। জাপান, মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা কিংবা কুরাসাওয়ের মতো দলের জার্সি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। নাইকির ক্ষেত্রেও ব্রাজিল, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় দলের জার্সি বিশ্বজুড়ে বিশাল বাজার তৈরি করছে। ফলে মাঠে কারা জিতছে, তার পাশাপাশি দোকানে কোন জার্সি বিক্রি হচ্ছে, সেটিও এই লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দুই প্রতিষ্ঠানের দ্বৈরথের মাঝেও পুমা নিজের জায়গা ধরে রাখছে। এবারের বিশ্বকাপে ১১টি দলের জার্সি সরবরাহ করছে তারা। উত্তর আমেরিকার বাজার পুমার জন্যও বড় সুযোগ। যুক্তরাষ্ট্রের তারকা ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকসহ কয়েকজন পরিচিত মুখকে সামনে রেখে পুমা ফুটবল বাজারে নিজেদের জায়গা বাড়াতে চাইছে।
তাহলে এগিয়ে কে—নাইকি নাকি অ্যাডিডাস?
উত্তরটি এক কথায় দেওয়া কঠিন। অনলাইন দর্শকসংখ্যা ও তারকা-চমকে নাইকি এগিয়ে। আয় ও বিশ্ববাজারের আকারেও তারা বড়। কিন্তু বিশ্বকাপের মাঠে দৃশ্যমানতা, অফিশিয়াল বল, দলসংখ্যা এবং সাম্প্রতিক ব্র্যান্ড-আস্থায় অ্যাডিডাস শক্ত অবস্থানে। নিউইয়র্কের রাস্তায়, দোকানের জানালায় এবং বিশ্বকাপের আনুষ্ঠানিক আবহে অ্যাডিডাস যেন একটু বেশি চোখে পড়ছে।
শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ের জয় নির্ধারিত হবে শুধু বিজ্ঞাপনের দর্শকসংখ্যা দিয়ে নয়। কোন জার্সি বেশি বিক্রি হলো, কোন জুতা বেশি জনপ্রিয় হলো, কোন তারকার প্রভাব তরুণদের পছন্দ বদলাল এবং বিশ্বকাপ শেষে কোন প্রতিষ্ঠান ফুটবল সংস্কৃতিতে বেশি জায়গা করে নিতে পারল—এসব মিলেই চূড়ান্ত ছবি পরিষ্কার হবে।
মাঠে বিশ্বকাপ জিতবে একটি দেশ। কিন্তু মাঠের বাইরে নাইকি ও অ্যাডিডাসের লড়াই চলবে আরও অনেক দিন। কারণ বিশ্বকাপ শেষ হলেও জার্সি, বিজ্ঞাপন, তারকা আর স্মৃতির বাজার তখনও শেষ হয় না।






