
ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যৌথ হামলা শুরুর প্রথম দিকে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছিলেন, এটি আর সেই আগের ইরান নেই, এটি আর আগের মধ্যপ্রাচ্য নেই এবং এটি সেই পুরোনো ইসরায়েলও নয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থনে তেহরানের শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানোর লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া সেই যুদ্ধের পরিণতি যে মাত্র ১০০ দিনের মাথায় সম্পূর্ণ উল্টে যাবে, তা হয়তো নেতানিয়াহু নিজেও কল্পনা করতে পারেননি।
গত বুধবার (১৭ জুন) যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক ইসরায়েলের সেই ‘মহাবিজয়ের’ স্বপ্নকে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এই চুক্তি ইসরায়েলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা বা ইরানকে দুর্বল করার পরিবর্তে উল্টো ইরানকেই কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে গেছে। চরম অপমানের বিষয় হলো, ইসরায়েল এই সমঝোতা স্মারকের চূড়ান্ত খসড়াটি দেখার অনুরোধ করলেও যুক্তরাষ্ট্র তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের নতুন মেরুকরণ
এই চুক্তির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নতুন যে আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি হচ্ছে, তা ইসরায়েলের জন্য চরম অস্বস্তিকর। ইসরায়েলি বিশ্লেষকরাও এই চুক্তির ভয়াবহতা স্বীকার করছেন। দৈনিক ‘হায়ারেৎজ’-এর প্রবীণ সাংবাদিক আমোস হারেল সামগ্রিক পরিস্থিতিকে শোচনীয় বলে অভিহিত করেছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ এটিকে ইসরায়েলের জন্য ঐতিহাসিক কূটনৈতিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। আর ওয়াশিংটভিত্তিক সাংবাদিক রন ক্যাম্পিয়াস আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, এই চুক্তি ইসরায়েলকে কতটা বিপদে ফেলেছে, তা বিশ্বাস করা কঠিন।
ইসরায়েলের সাধারণ জনগণ এবং বিশ্বজুড়ে থাকা ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ, যারা নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসন ও নীতিকে পছন্দ করেন না, তারাও এই চুক্তিতে স্বস্তি পাচ্ছেন না। কারণ, নেতানিয়াহুর এই ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক পরাজয় শেষ পর্যন্ত পুরো ইসরায়েলের জন্যই বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও ট্রাম্পের নীতি
সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, ইরান পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না। কিন্তু সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলছেন, বহু বছর ধরে যে দেশ পারমাণবিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, তাদের এই প্রতিশ্রুতির মূল্য কতটুকু?
আরও প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তত্ত্বাবধানে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে সাইটেই বিনষ্ট বা ডাউন-ব্লেন্ড করা হবে, এর মানে কী?
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্প্রতি ইরানের হাতে থাকা প্রায় আধা টন উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামকে ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’ বা পারমাণবিক ধুলো বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম দিয়ে অন্তত এক ডজন প্রাথমিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো থেকে স্পষ্ট যে, তিনি ইরানের ‘প্রয়োজন’ বা স্বার্থের প্রতি এক ধরনের সহনশীলতা দেখাচ্ছেন। ট্রাম্প প্রশ্ন তুলেছেন, সৌদি আরবের যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকতে পারে, তবে ইরানের কেন থাকবে না? কিংবা অন্য দেশগুলোর মতো ইরান কেন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পারমাণবিক শক্তি উন্নয়ন করতে পারবে না?
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প এখানে সৌদির বদলে ইসরায়েলের উদাহরণও টানতে পারতেন। এই নতুন সমীকরণে ট্রাম্প মূলত বুঝিয়েছেন—ইসরায়েলের যদি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং পারমাণবিক সাইট থাকতে পারে, তবে ইরানকে কেন বঞ্চিত করা হবে?
এছাড়া চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা বজায় রাখার অর্থ কী? ইরান কি তার ইউরেনিয়াম মজুত লুকিয়ে রাখবে, নাকি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাবে? সিএনএনের প্রতিবেদনে উল্লেখিত ইরানের তথাকথিত ‘গোপন প্রতিশ্রুতি’গুলো কী এবং সেগুলোর বাস্তব মূল্যই বা কতটুকু— সে প্রশ্নও তুলছেন বিশ্লেষকেরা।
লেবানন ফ্রন্টে নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে ইসরায়েল
লেবাননে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে বিশাল বিনিয়োগ করেও ইসরায়েল বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে। নতুন এই চুক্তি মার্কিন-ইরান শত্রুতা অবসানের শর্তের সাথে লেবানন পরিস্থিতিকে সরাসরি যুক্ত করেছে। এর ফলে একদিকে যেমন লেবাননে ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ, আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব বন্ধ করার জন্য চাপ তৈরি হয়েছে, তেমনি কৌশলগত দিক থেকে ইসরায়েলের জন্য এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। কারণ, হিজবুল্লাহর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ইরানের হাতেই এখন এই যুদ্ধবিরতির চাবিকাঠি।
সহজ কথায়, লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক নীতি এখন অনেকটাই তেহরানের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই সমঝোতা স্মারককে একটি আঞ্চলিক শান্তি চুক্তির রূপরেখা হিসেবে ঘোষণা করেছেন, যেখানে ইসরায়েলকে আলোচনার টেবিলেই রাখা হয়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হওয়ার যে স্বপ্ন নেতানিয়াহু দেখছিলেন, তা ভেঙে ইসরায়েল এখন একটি সাধারণ মধ্যম সারির শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। বিপরীতে, ইরান বিপুল তেল রাজস্ব এবং প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল পুনর্গঠনের সুবিধা পেতে যাচ্ছে— যা ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাজেটের চেয়ে ছয় গুণ বেশি।
এর ফলে গত তিন বছর ধরে অনেক রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে হামাস ও হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতাদের হত্যা করে ইসরায়েল যে আঞ্চলিক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছিল, তা এক ধাক্কায় নসাৎ হয়ে গেল।
কর্মফলের মুখোমুখি নেতানিয়াহু
ইসরায়েলের শান্তিপ্রিয় বা যুদ্ধবিরোধী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ও বসতি স্থাপন বন্ধে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের স্বপ্ন দেখছিল। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ ঠিকই এলো, তবে তা ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষার জন্য নয়, বরং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ, আর্থিক ক্ষুধা ও অহংকার মেটানোর জন্য— যা ইসরায়েলের আত্মরক্ষার মৌলিক সক্ষমতাকেই দুর্বল করে দিচ্ছে।
নেতানিয়াহু মার্কিন ডেমোক্রেটিক পার্টি, ইউরোপ ও প্রবাসী ইহুদি গোষ্ঠীকে উপেক্ষা করে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিজের একমাত্র ত্রাণকর্তা বানিয়েছিলেন। আজ তিনি নিজের সেই ভুলেরই খেসারত দিচ্ছেন।
ট্রাম্প এখন ইসরায়েলকে কৌশলগতভাবে একঘরে করার নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং নেতানিয়াহুর ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ উপভোগ করছেন। ট্রাম্প প্রায়ই জনসমক্ষে বলছেন, আমি না থাকলে ইসরায়েলের কোনো অস্তিত্বই থাকত না।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বোঝাতে চেয়েছিলেন যে তিনিই রাষ্ট্রের শেষ কথা এবং নিজেকে বাঁচাতে তিনি রাষ্ট্রের যেকোনো স্তম্ভ ভেঙে ফেলতে পারেন। কিন্তু ট্রাম্পকে নিজের মনের মতো ভাবাটাই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। এখন তেহরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের যে স্বপ্ন নেতানিয়াহু দেখেছিলেন, তা উল্টো ইসরায়েলের নিজের ভেতরেই ঘটার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে আগামী দিনগুলোতে মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতির যেকোনো ব্যর্থতার জন্য ইসরায়েল ও নেতানিয়াহুকেই এককভাবে দায়ী করা হবে। বলা বাহুল্য, কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট আর ইসরায়েলের জন্য ঝুঁকি নেবেন না। নেতানিয়াহুর কারণে ইসরায়েলের এখন শোচনীয় অবস্থা যে তিনি ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বসে আছেন, আর থলে কতটা ভর্তি হবে তা ট্রাম্পই ঠিক করবেন। ২০২৮ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।
ইসরায়েলের দৈনিক হারেৎজ থেকে অনূদিত
লেখক: দৈনিক হারেৎজের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক।




