আলজাজিরার এক্সপ্লেইনার/শত্রুতা কি তবে বাণিজ্যে রূপ নিচ্ছে, কেমন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান লেনদেন?

যশরাজ শর্মা
শত্রুতা কি তবে বাণিজ্যে রূপ নিচ্ছে, কেমন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান লেনদেন?
সুইজারল্যান্ডের বারজেনস্টকে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ (বামে) এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি (মাঝে)। ২১ জুন ২০২৬। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ব্যয়ের একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছে।

Advertisement

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই বিষয়ে অনড়। তারা বলছে, অবমুক্ত করা এই অর্থ দিয়ে কেবল মার্কিন কৃষিপণ্যই কেনা হবে। পরে সেইসব পণ্য ইরানে সরবরাহ করা হবে।

নতুন এই পরিকল্পনা সফল হলে দুই দেশের বাণিজ্যে ১২ বিলিয়ন (১ হাজার ২০০ কোটি) ডলারের নতুন গতি ফিরতে পারে। বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য অত্যন্ত সীমিত। এটি মূলত কিছু মানবিক সহায়তাসামগ্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ।

গত পাঁচ দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ অংশীদার থেকে চরম শত্রুতায় রূপ নিয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রায় কিছুই অবশিষ্ট নেই। পরিকল্পনাটি শুনতে অদ্ভুত মনে হতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি আসলেই তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ফেরাতে পারবেন?

আটকে থাকা সম্পদের কী হচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার অনেক বিষয়ের মতো এটিতেও দুই পক্ষ এখনো পুরোপুরি একমত হতে পারেনি। এখন পর্যন্ত কোন বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য ভিন্ন।

গত সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) সই হয়। এরপর গত সোমবার সুইজারল্যান্ডে প্রথম দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ জানান, আটকে থাকা ১২ বিলিয়ন ডলার অর্থ ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে একটি চুক্তি হয়েছে।

তবে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তিনি জানান, ইরানের সম্পদ অবমুক্ত করা হলে সেই অর্থ দিয়ে তাদের মার্কিন কৃষিপণ্যই কিনতে হবে। ভ্যান্সের মতে, ‘এই অর্থ আমেরিকার কৃষকদের আরও সমৃদ্ধ করবে এবং ইরানের মানুষের খাদ্যের সংস্থান হবে।’

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এই চুক্তির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘একটি ন্যায্য ও যৌক্তিক চুক্তির লক্ষ্যে আমাদের আলোচনা খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। ইরানের প্রয়োজনীয় ভুট্টা, সয়াবিনসহ সবকিছুই আমাদের কৃষকদের কাছ থেকে কেনা হবে। এতে আমাদের কৃষকেরা খুব খুশি। আমি অনেকের ফোন পেয়েছি এবং তারা এই সিদ্ধান্তে দারুণ আনন্দিত।’

পরদিন ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্ট দেন। তিনি লেখেন, মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ যে অর্থ বা নিষেধাজ্ঞা ছাড় দিচ্ছে, তা একটি ‘এসক্রো’ অ্যাকাউন্টে জমা থাকবে।

এই অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ করবে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অর্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকেই খাদ্য ও ওষুধ কেনার কাজে ব্যয় করা হবে। আমাদের মহান মার্কিন কৃষকদের কাছ থেকে ভুট্টা, গম ও সয়াবিন কেনা হবে। ইরানের এই জিনিসগুলো খুব জরুরি দরকার।

ট্রাম্প আরও যোগ করেন, ‘এটি একটি মানবিক সংকট। আমার মনে হয় খুব দেরি হওয়ার আগেই এখনই সাহায্য করা প্রয়োজন। আলোচনা বেশ ভালো এগোচ্ছে!’

তবে ইরান এই শর্তে রাজি হয়েছে এমন কোনো নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই বলেন, সম্পদগুলো অবমুক্ত করা হবে এবং ইরান সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তা ব্যবহার করবে। জাতির যা প্রয়োজন, তা কিনতে এই অর্থ খরচ করা হবে।

বাঘেই আরও যোগ করেন, কৃষিপণ্য কেনা হবে মূলত ‘দরদাম ও গুণমানের’ ওপর ভিত্তি করে। ওয়াশিংটনের চাপিয়ে দেওয়া কোনো শর্তে নয়। তিনি ব্যঙ্গ করে বলেন, ‘বিষয়টি বেশ মজার। যে যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করা এবং ইরানের পতন ঘটানো, সেই যুদ্ধের উদ্দেশ্য এখন মার্কিন কৃষকদের ধনী বানানোতে এসে ঠেকেছে।’

জেনেভায় নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী বাহরাইনিও মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘এই সম্পদ দিয়ে কী করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র অধিকার কেবল ইরানের।’

তেহরানের একটি দেয়ালে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে নিহতদের ছবিসংবলিত মানচিত্র। ১৭ জুন ২০২৬। ছবি: এএফপি
তেহরানের একটি দেয়ালে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে নিহতদের ছবিসংবলিত মানচিত্র। ১৭ জুন ২০২৬। ছবি: এএফপি

চুক্তি কীভাবে হবে?

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের ফেলো গ্যারি হাফবাওয়ার বলেন, অবমুক্ত করা সম্পদের ওপর ব্যয়ের শর্ত দেওয়ার যে কোনো চেষ্টা আলোচনাকে দীর্ঘায়িত করবে। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, আসলে অনেক মার্কিন কংগ্রেস সদস্য এই ইরান চুক্তির বিরোধিতা করছেন। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক ঝুঁকি এবং রাজনৈতিক উত্তাপ নিয়ে সতর্ক থাকবে।

জার্মানির ফিলিপস-ইউনিভার্সিটি মারবার্গের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ রেজা ফারজানেগান বলেন, ইরানকে মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্য করার পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্টের জোরালো উদ্দেশ্য আছে। তিনি ইরানের ওপর এই অবৈধ যুদ্ধে নিজের ভাবমূর্তি কিছুটা উজ্জ্বল করতে চাইছেন।

ওই অর্থনীতিবিদ আরও বলেন, চীনের সঙ্গে ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে মার্কিন কৃষকেরা, বিশেষ করে সয়াবিন রপ্তানিকারকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ইরানের আটকে থাকা সম্পদ মার্কিন কৃষিপণ্য কেনায় ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়াশিংটন একে ‘মানবিক বাণিজ্য’ হিসেবে প্রচার করতে পারবে। তবে আসলে এটি নিজ দেশে নিজের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর একটি কৌশল মাত্র।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক ‘পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকস’-এর সিনিয়র ফেলো কালেন হেন্ডরিকস একটি মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্তাবের মাধ্যমে ইরানকে সরাসরি অর্থ দেওয়া এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। কারণ সরাসরি অর্থ দিলে তা যুক্তরাষ্ট্রের ‘নতি স্বীকার’ হিসেবে গণ্য হতো।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কি কোনো বাণিজ্য হয়? উত্তর হলো—হ্যাঁ। তিক্ত সম্পর্ক আর কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সীমিত পরিসরে লেনদেন চালু আছে। তবে এই বাণিজ্যের পাল্লা অনেকখানি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে দুই দেশের সরাসরি বাণিজ্যের পরিমাণ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে খুবই নগণ্য। মূলত মানবিক কারণ এবং নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত পণ্যই এই বাণিজ্যের প্রধান অংশ। এর মধ্যে রয়েছে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও কৃষিপণ্য।

মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে মোট ৮৩ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য ও সেবা লেনদেন হয়েছে। ২০২৩ সালের তুলনায় এই হার ৩ শতাংশ বেশি।

মোট বাণিজ্যের বড় অংশই ছিল সেবা খাত। সেবা খাতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর মধ্যে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের সেবা যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইরানে গেছে। এ ছাড়া যেসব পণ্য লেনদেন হয়েছে, তার প্রায় সবই ছিল ইরানে পাঠানো মার্কিন পণ্য।

কোনো শান্তি চুক্তি হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পুনরায় বড় আকারের বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা বেশ কঠিন। বিশ্লেষকরা আল জাজিরাকে বলেন, ওয়াশিংটন বা তেহরান—কোনো পক্ষই নিজ দেশের মানুষের কাছে এ ধরনের চুক্তির গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারবে না। তবে কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দুই দেশই নমনীয় হতে পারে।

কালেন হেন্ডরিকস আল জাজিরাকে বলেন, ইরান যদি বিপুল পরিমাণ কৃষিপণ্য কেনা শুরু করে, তবে তাদের মূল লক্ষ্য হবে ভুট্টা ও সয়াবিন। তবে তারা এমনভাবে এগুলো কিনবে না যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা তৈরি হয়।

দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনা এখনও পুরোপুরি কমেনি। আলোচনা ব্যর্থ হলে যেকোনো সময় পুরোদমে যুদ্ধ শুরুর হুমকি দিয়ে রেখেছে উভয় পক্ষই। হেন্ডরিকস মনে করেন, খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাই এখন ওয়াশিংটনের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে ভয় পাচ্ছে। শত্রু হিসেবে ইরানের জন্য এই নির্ভরতা কমানোর যুক্তি আরও জোরালো।

ইরান যদি শেষ পর্যন্ত কিছু মার্কিন পণ্য কিনতে বাধ্যও হয়, তবুও তারা তাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল হবে না। হেন্ডরিকসের মতে, একে বড়জোর কৌশলগত সমন্বয় বলা যেতে পারে, স্থায়ী সুসম্পর্ক নয়।

অর্থনীতিবিদ ফরজানগেন আল জাজিরাকে বলেন, দুই দেশের বাণিজ্যের সুযোগ খুব সীমিত। খাদ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম খাতের বাইরে খুব বেশি কিছু করার নেই। ইরান এ বছর ২ কোটি ২০ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে পারে। এই বিশাল আমদানিতে কয়েকশ কোটি ডলার খরচ হবে, যার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যেতে পারে। অন্যদিকে হাফবাউয়ার মনে করেন, ইরানও প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করার সুযোগ পেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বাণিজ্যের ইতিহাস

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। ১৯৫০ থেকে ৭০-এর দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত দুই দেশের বাণিজ্য দ্রুত বাড়ছিল। ১৯৫৩ সালে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে হটিয়ে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে সাহায্য করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। মোসাদ্দেক ইরানের তেল শিল্প জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন।

সেই সময় ইরানের তেলের বড় বাজার ছিল যুক্তরাষ্ট্র। বিনিময়ে ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে বিমান, অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি, গাড়ি ও প্রযুক্তি বিক্রি করত। বোয়িং, জেনারেল ইলেকট্রিক ও বেল টেক্সট্রনের মতো বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোর ইরানে বিশাল ব্যবসা ছিল।

১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে শাহ রাজবংশের পতন ঘটে। ওই বছর তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে ৪৪৪ দিনের জিম্মি সংকট চলাকালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের সম্পদ জব্দ করেন। একই সঙ্গে ইরানি পণ্য আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা দেন তিনি। ১৯৯৫ সালে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

তেহরানে প্রদর্শিত একটি ব্যানারে দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে দৃঢ়ভাবে ইরানের পতাকা ধরে থাকা ছবি। ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি। ছবি: এপি
তেহরানে প্রদর্শিত একটি ব্যানারে দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে দৃঢ়ভাবে ইরানের পতাকা ধরে থাকা ছবি। ২০২৬ সালের ১৪ জানুয়ারি। ছবি: এপি

২০১৫ সালে ওবামা প্রশাসনের সময় পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরিত হলে ইরানের ওপর থেকে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে এককভাবে সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান বাণিজ্যের ইতিহাস

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আগে ইরান ছিল মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র। ১৯৫০ থেকে ৭০-এর দশকের শেষ ভাগ পর্যন্ত দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক খুব দ্রুত বাড়ছিল। ১৯৫৩ সালে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে হটিয়ে দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এরপর তারা শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে বড় ভূমিকা রাখে। উল্লেখ্য, মোসাদ্দেক চেয়েছিলেন ইরানের তেল শিল্প জাতীয়করণ করতে।

সেই সময়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি ছিল তেল। ইরান যুক্তরাষ্ট্রে প্রচুর তেল রপ্তানি করত। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তাদের কাছে উড়োজাহাজ, আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম, কলকারখানার যন্ত্রপাতি, গাড়ি, কৃষিপণ্য ও উন্নত প্রযুক্তি বিক্রি করত। বোয়িং, জেনারেল ইলেকট্রিক এবং বেল টেক্সট্রনের মতো বড় মার্কিন কোম্পানিগুলোর ইরানে ব্যাপক ব্যবসা ছিল। ১৯৭৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে পাহলভী রাজবংশের পতন ঘটলে এই সম্পর্কের ইতি ঘটে।

১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে ৪৪৪ দিনের জিম্মি সংকট শুরু হয়। তখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার ইরানের কয়েক শ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেন। একই সঙ্গে ইরানি পণ্য আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা দেন। ১৯৯৫ সালে এসে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন এক নির্বাহী আদেশে ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্যের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।

২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি (জেসিপিওএ) সই হয়। এর ফলে দেশটির ওপর থেকে বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের টানাপোড়েন আবারও শুরু হয়।

লেখক পরিচিতি

যশরাজ শর্মা আল জাজিরা ডট কমের একজন প্রতিবেদক। বর্তমানে তিনি ভারতের নয়াদিল্লিতে কর্মরত। তিনি আল জাজিরার দক্ষিণ এশিয়া ডেস্ক এবং এক্সপ্লেইনার ডেস্কে সংবাদ, ফিচার ও বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন লেখেন। তার প্রতিবেদনের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে মানবাধিকার, কাশ্মীর সংঘাত এবং ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যু নিয়েও কাজ করেন।

২০১৮ সালে যশরাজ জুনিয়র রিপোর্টার হিসেবে ‘ভাইস’–এর প্রথম ভারতীয় দলে যোগ দেন। এরপর ২০১৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ভারত-শাসিত কাশ্মীরে ছিলেন। সেখানে তিনি স্থানীয় নিউজ ম্যাগাজিন ‘দ্য কাশ্মীর ওয়ালা’তে কাজ করতেন।

২০২২ সালে ভারত সরকার কাশ্মীরের সাংবাদিকদের ওপর কঠোর অভিযান চালায়। সে সময় ম্যাগাজিনটির জ্যেষ্ঠ সম্পাদকরা গ্রেপ্তার হলে যশরাজ সাময়িকভাবে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। পত্রিকাটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।