মিডল ইস্ট আইয়ের কলাম/ইরান যুদ্ধ দেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো?

আহমেদ মাওলানা
ইরান যুদ্ধ দেখে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প খুঁজছে উপসাগরীয় দেশগুলো?
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও মধ্যপ্রাচ্যের নেতারা। ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধের প্রভাব কেবল সামরিক ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঝেমধ্যে যুদ্ধ পুরো একটি অঞ্চলের রূপরেখা পাল্টে দেয়।

Advertisement

এর উদাহরণে দুইটি সময়ের কথা বলা যায়। ১৯৯০ সালে কুয়েতে ইরাকের আগ্রাসন আরব বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তাবলয়ের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল। অন্যদিকে, ২০০৩ সালে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক সংঘাতের জন্ম দেয়। এই সংঘাত প্রায় দুই দশক ধরে ওই অঞ্চলের ভাগ্য নির্ধারণ করেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধও হয়তো এমন একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে যাচ্ছে। এই যুদ্ধ একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। উপসাগরীয় মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের সক্ষমতারও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা এই অঞ্চলে আঞ্চলিক শক্তিগুলো এখন নিজেদের মধ্যে নতুন ধরনের সমন্বয় ও জোট গঠনের পথ খুঁজছে।

সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানের মধ্যে ইতোমধ্যে এমন একটি নতুন জোটবদ্ধতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আঞ্চলিক নানা সংকটে তারা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সমন্বিত অবস্থান নিচ্ছে।

অন্যদিকে, এর ঠিক বিপরীতে আরেকটি জোটের সম্পর্ক গভীর হচ্ছে। এই জোটে রয়েছে ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, গ্রিস, সাইপ্রাস ও ইথিওপিয়া।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি উপসাগরীয় দেশগুলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তার যে সমীকরণ কাজ করত, তার দুর্বলতা এখন উন্মোচিত।

বছরের পর বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে। তারা নিজেদের উপসাগরীয় নিরাপত্তার একমাত্র রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরেছে।

তবে যুদ্ধটি প্রমাণ করেছে যে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি থাকলেই আঞ্চলিক সংঘাতের আঁচ থেকে রক্ষা পাওয়া যায় না। উল্টো, এটি আয়োজক দেশগুলোকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত চরম ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কাতারে ইরানের হামলার ফলে সাময়িকভাবে দেশটির তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।এর মানে এই নয় যে উপসাগরীয় দেশগুলো এখনই ওয়াশিংটনের সঙ্গ ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কাতারের দোহায় আয়োজিত বৈঠকে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং অন্যান্য উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: সংগৃহীত
কাতারের দোহায় আয়োজিত বৈঠকে কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং অন্যান্য উপসাগরীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ছবি: সংগৃহীত

অদূর ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তবে উপসাগরীয় সরকারগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নিরঙ্কুশ নির্ভরশীলতা কমাতে চাইছে। এ জন্য তারা বিকল্প বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার সন্ধান করছে।

রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা

এ ক্ষেত্রে রিয়াদ, আংকারা, কায়রো ও ইসলামাবাদের মধ্যে গড়ে ওঠা সমন্বয় সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই দেশগুলোর প্রত্যেকের আলাদা শক্তি রয়েছে। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল আর্থিক সক্ষমতা। তুরস্কের আছে উন্নত প্রতিরক্ষা শিল্প। মিসরের রয়েছে বিশাল সামরিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব।

আর পাকিস্তানের রয়েছে রাজনৈতিক, সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা। এই সবকটি শক্তি একত্রিত হলে তা ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার এক শক্ত ভিত্তি তৈরি করে।

তবে এই উদীয়মান মেরুকরণকে এখনই একটি সুসংগঠিত জোট বলাটা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। এসব দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ইতিহাসে গভীর দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাসের ছাপ রয়েছে। তাদের কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলোও সব সময় এক বিন্দুতে মেলে না।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে প্রবল পারস্পরিক অবিশ্বাস রয়েছে। এখানকার রাষ্ট্রগুলোর নীতি সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার চেয়ে তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলা এবং স্বল্পমেয়াদি হিসাব-নিকাশের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হয়।

উদাহরণ হিসেবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর দিকে তাকানো যায়।

২০১৭ সালে কাতারের ওপর অবরোধ আরোপকে কেন্দ্র করে সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। আবার ২০১৩ সালে মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মিসর ও তুরস্কের সম্পর্কে ফাটল ধরে। এ ছাড়া লিবিয়া সংকট নিয়েও তাদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল।

একই সময়ে ইসরায়েলও অংশীদারত্বের একটি নতুন নেটওয়ার্ক তৈরি করছে বলে মনে হচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে তারা ‘প্রান্তিক নীতি’ অনুসরণ করত। এর মাধ্যমে তারা আরব বিশ্বের চারপাশের দেশগুলোর সঙ্গে জোট বেঁধে আরবদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছিল।

বর্তমান নীতিটি সেই পুরোনো নীতিরই একটি পরিমার্জিত রূপ। তবে এখন এর পরিধি আরও বিস্তৃত এবং কৌশলও অনেক বেশি আধুনিক। এই নেটওয়ার্ক এখন হর্ন অব আফ্রিকা থেকে শুরু করে পূর্ব ভূমধ্যসাগর ও ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এখানে নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক স্বার্থকে এক সুতোয় গাঁথা হয়েছে।

এই নতুন নেটওয়ার্কের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হয়ে উঠেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০২০ সালে ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’ স্বাক্ষরিত হওয়ার পর থেকে আবুধাবি ও তেল আবিবের সম্পর্ক বহুদূর গড়িয়েছে। সামুদ্রিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো খাতে তাদের সহযোগিতা সম্প্রসারিত হয়েছে।

‘আইটু-ইউটু’ জোটের মাধ্যমে ভারত এই নেটওয়ার্কের আরেকটি মূল উপাদানে পরিণত হয়েছে। এই জোটের মাধ্যমে ভারত, ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

একই সঙ্গে ‘ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডর’ প্রকল্পটি ইসরায়েলের উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিলে যায়। ইসরায়েল তাদের বন্দরগুলোকে এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যে ট্রানজিট হাব হিসেবে রূপান্তর করতে চায়।

এ ছাড়া ভারত ইতোমধ্যেই ইসরায়েলি অস্ত্রের একটি প্রধান ক্রেতা। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইসরায়েলের অস্ত্র রপ্তানির প্রায় ৩৪ শতাংশই গেছে ভারতে। এই সময়ে ভারতই ছিল ইসরায়েলি অস্ত্রের একক বৃহত্তম আমদানিকারক।

অংশীদারত্বের নতুন নেটওয়ার্ক

গ্রিস ও সাইপ্রাস এই ইসরায়েলি নেটওয়ার্কের পশ্চিমাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০১০ সালে গাজায় ত্রাণবাহী জাহাজ ‘মাভি মারমারা’-তে ইসরায়েলের প্রাণঘাতী হামলার পর তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। এরপর থেকে ইসরায়েল জ্বালানি ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গ্রিস ও সাইপ্রাসের সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে। এই সম্পর্কগুলো পূর্ব ভূমধ্যসাগরে তুরস্কের প্রভাব মোকাবিলার একটি ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

পাশাপাশি এটি সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতের অর্থনৈতিক উদ্যোগগুলোর সঙ্গে ওই অঞ্চলকে যুক্ত করছে। আরও দক্ষিণে ইথিওপিয়া এবং সোমালিল্যান্ড এই পরিবর্তনশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বড় ভূমিকা পালন করছে। ইথিওপিয়া সমুদ্রে নিজেদের প্রবেশাধিকার চাইছে।

অন্যদিকে সোমালিল্যান্ড তাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী রাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করছে। গাজা যুদ্ধের সময় হুতিদের হামলার কারণে ইসরায়েল এই অঞ্চলের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। তারা নিজেদের নৌপথ সুরক্ষিত করতে এবং লোহিত সাগরের দক্ষিণাঞ্চলীয় হুমকি মোকাবিলা করতে তৎপর।

এর ফলে লোহিত সাগর ও হর্ন অব আফ্রিকায় ইথিওপিয়া, আমিরাত এবং ইসরায়েলের স্বার্থ এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। তবে কায়রো, রিয়াদ এবং আংকারা এই ঘটনাকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে।

এত কিছুর পরও, মধ্যপ্রাচ্য দুটি অনড় ও বিরোধী ব্লকে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে—এমনটা ভাবা ভুল হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বলে, সেখানে স্থিতিশীল জোট গঠন করা সবসময় একটি কঠিন কাজ।

এই অঞ্চলে পারস্পরিক অবিশ্বাসের মাত্রা অনেক বেশি। রাষ্ট্রগুলো দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্বের চেয়ে বরং তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

সহজ করে বললে, সৌদি আরবের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ালেও মিসর কোনোভাবে আমিরাতের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সমর্থনকে উপেক্ষা করতে পারবে না। তা ছাড়া, ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিশুক্তি বজায় রাখাকেও তারা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

অন্যদিকে তুরস্ক সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করেছে। এই সম্পর্ক নষ্ট করার কোনো কারণ আপাতত আংকারার নেই।

তাই মধ্যপ্রাচ্যে এখন যা দেখা যাচ্ছে, তা কোনো অনড় জোট নয়। বরং এটি নমনীয় এবং একে অপরের পরিপূরক অংশীদারত্বের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। রাষ্ট্রগুলো এক ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করলেও, অন্য ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতায় নামতে পারে। তারা হয়তো নিরাপত্তা ইস্যুতে একজোট হবে, কিন্তু অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একে অপরের বিরুদ্ধাচরণ করবে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধটি হয়তো প্রথাগত অর্থে নতুন কোনো জোট তৈরি করবে না। তবে এটি আঞ্চলিক মেরুকরণের চলমান প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের পুরোনো হিসাব-নিকাশগুলো যখন ফিকে হয়ে আসছে, তখন এই যুদ্ধ আঞ্চলিক শক্তিগুলোকে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থার সন্ধান করতে বাধ্য করছে।

এমন এক সময়ে এই ঘটনা ঘটছে, যখন নিরাপত্তা, সম্পদ, সমুদ্রপথ, জ্বালানি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে।


মিডল ইস্ট আই থেকে অনূদিত


লেখক: আহমেদ মাওলানা পেশায় একজন গবেষক। তিনি মূলত আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে কাজ করেন। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সাবাহাত্তিন জাইম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন। আগে তিনি রাজনীতি ও নিরাপত্তা নিয়ে ‘ইহাতা’ নামের একটি পডকাস্ট সঞ্চালনা করতেন।