logo

৫ বছর ধরে বিনা বেতনে রেলক্রসিং পাহারা দিচ্ছেন ভ্যানচালক ইসলাম

৫ বছর ধরে বিনা বেতনে রেলক্রসিং পাহারা দিচ্ছেন ভ্যানচালক ইসলাম
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার জগথা এলাকার অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেন আসার মুহূর্তে বাঁশের ব্যারিয়ার ফেলে পথচারী ও যানবাহনকে আটকে রাখছেন ভ্যানচালক ইসলাম হোসেন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলায় গত পাঁচ বছর ধরে বাঁশ দিয়ে ব্যারিয়ার তৈরি করে রেলক্রসিং পাহারা দিচ্ছেন ইসলাম হোসেন নামের এক ভ্যানচালক। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়, কেবল মানুষের জীবন বাঁচানোর তাগিদেই স্বেচ্ছায় এ কাজ করছেন তিনি।

ইসলাম হোসেনের বাড়ি পীরগঞ্জ রেললাইনের পাশে। তিনি তিন সন্তানের জনক ও পেশায় ভ্যানচালক।

জানা যায়, ২০২১ সালে পীরগঞ্জ রেলস্টেশনের উত্তরে উপজেলা ভূমি অফিসের পশ্চিমে পৌর শহরের জগথা এলাকার একটি ব্যস্ততম অরক্ষিত রেলক্রসিংয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে জেলা জজশিপের দুই কর্মচারীর মৃত্যু হয়। নিজ চোখে সেই দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন ইসলাম হোসেন। কোনো গেটম্যান না থাকায় সেখানে এমন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এরপর থেকেই তিনি ওই রেলক্রসিংয়ে বাঁশের ব্যারিয়ার বানিয়ে নিয়মিত গেটকিপারের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। জীবিকার তাগিদে ভ্যান চালাতে তিনি এলাকার বাইরে গেলে তার পরিবারের সদস্য বা স্থানীয় বাসিন্দারা এ দায়িত্ব সামলান। তার এ উদ্যোগের কারণে গত পাঁচ বছরে ওই রেলক্রসিংয়ে আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি।

পীরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা আজমল হক বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে ভ্যানচালক ইসলাম হোসেনকে দেখছি। ট্রেন আসার সময় হলেই তিনি রাস্তায় বাঁশ ফেলে দাঁড়িয়ে যান; কাউকে পারাপার হতে দেন না। ট্রেন চলে যাওয়ার পরই পথ ছেড়ে দেন, যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে। এটা অত্যন্ত মহৎ একটি কাজ। তার মতো এমন দায়িত্ববোধ কজন দেখাতে পারে।

নাইমুর রহমান নামের অপর এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, এটা তো সরকারের কাজ, সরকারি কর্মচারীদের করার কথা। অথচ ইসলাম কোনো বেতন ছাড়াই দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে কাজটি করে যাচ্ছেন, যা নজিরবিহীন। বেতন দিলেও অনেক কর্মচারী ফাঁকি দেন, কিন্তু তিনি সব সময় সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

বিলকিস নামের এক নারী বলেন, তিনি ভ্যানচালক এক দিন ভ্যান না চালালে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হয়। তা সত্ত্বেও তিনি এ কাজ করছেন। নিজের রুটিরুজি ছেড়ে অন্যের সুরক্ষার কথা ভাবা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। সরকারের উচিত তার জন্য কিছু করা।

ইসলাম হোসেনের স্ত্রী নাজমা পারভীন বলেন, আমার স্বামী ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। পাঁচজনের সংসারে অভাব-অনটনে দিন কাটে। একদিন ভ্যান না নিয়ে বের হলে কষ্টে দিন পার করতে হয়। তা সত্ত্বেও গত পাঁচ বছর ধরে আমার স্বামী ভ্যানের ট্রিপ বাদ দিয়ে সময়মতো এসে বাঁশ ফেলে পথ আটকান। কাজটা নিশ্চয়ই মহৎ, কিন্তু আমাদের কথা তো কেউ ভাবে না। আজ পর্যন্ত কেউ তার পাশে দাঁড়ায়নি। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি, তাকে উপযুক্ত সম্মান ও সহযোগিতা দেওয়া হোক।

পীরগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি জয়নাল আবেদিন বাবুল বলেন, ইসলাম হোসেন একজন ভ্যানচালক হয়েও মানুষের জীবন বাঁচাতে যে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও নজিরবিহীন।

এ বিষয়ে ইসলাম হোসেন বলেন, আমি ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাই। অনেক সময় দূরে ভাড়ায় যেতে হয়, অথচ পাঁচ সদস্যের পুরো পরিবার আমার ওপর নির্ভরশীল। স্বেচ্ছাশ্রমে আর কত দিন এভাবে দায়িত্ব পালন করা যায়? এটি শহরের একটি ব্যস্ততম রেলক্রসিং, যেখান দিয়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন চলাচল করে। এখানে দ্রুত স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া জরুরি।

পীরগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার সোহরাব হোসেন জানান, এই রুটে প্রতিদিন পাঁচটি আন্তনগর ও একটি কমিউটার ট্রেন চলাচল করে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এক ব্যক্তি বাঁশের ব্যারিয়ার দিয়ে জগথা এলাকায় স্বেচ্ছায় রেলক্রসিং পাহারা দিচ্ছেন বিষয়টি তারা জানেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করেছেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদার জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলকে জানানো হবে। স্থায়ী গেটম্যান নিয়োগ না হওয়া পর্যন্ত স্থানীয়ভাবে ইসলাম হোসেনকে কোনো সহযোগিতা করা যায় কি না, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলবেন।