একপাশে আজান, অন্যপাশে উলুধ্বনি: নড়াইলে সম্প্রীতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি

এক পাশে আজানের ধ্বনি, অন্য পাশে উলুধ্বনি। পশ্চিমে মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় করছেন মুসল্লিরা, মাত্র ১০০ ফুট পূর্বে মন্দিরে চলছে পূজার্চনা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনে রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থান। বছরের পর বছর এভাবেই পাশাপাশি চলছে দুই ধর্মের মানুষের উপাসনা। নড়াইল শহরের মহিষখোলা এলাকার এই চিত্র যেন সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
শুধু মহিষখোলা নয়, নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম ও পুলিশ লাইন এলাকাতেও পাশাপাশি মসজিদ-মন্দিরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে সম্প্রীতির পরিবেশ। ধর্ম আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যই এসব এলাকার মানুষের একসঙ্গে বসবাসের ভিত্তি।
মহিষখোলা এলাকায় ১৯৮০ সালে নিজস্ব জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হয় মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির। এর পাঁচ বছর পর, ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মহিষখোলা পুরাতন সাব-রেজিস্ট্রি অফিস জামে মসজিদ। মসজিদ ও মন্দিরের মাঝখানে রয়েছে শরীফ আব্দুল হাকিম ও নড়াইল এক্সপ্রেস হাসপাতাল। সামনে দিয়ে চলে গেছে পাকা সড়ক। পাশাপাশি অবস্থিত এসব স্থাপনার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বজায় রয়েছে ধর্মীয় সহাবস্থান।
এ বছর নড়াইল জেলায় ৫৪৩টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলায় ২৪৯টি, কালিয়ায় ১৪৪টি এবং লোহাগড়ায় ১৫০টি। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর সহনশীলতার মধ্য দিয়ে পাশাপাশি বসবাসের এই চিত্র নড়াইলের সামাজিক জীবনে সম্প্রীতির একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা এশিয়া পোস্টকে জানান, মহিষখোলা এলাকায় হিন্দু-মুসলিম এক পরিবারের সদস্যের মতো বসবাস করেন। ধর্মীয় উৎসব ও উপাসনা পালনে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকেন তারা। এ কারণে এলাকায় ধর্মীয় বিরোধ বা সংঘাতের কোনো ঘটনা তাঁদের চোখে পড়েনি বলে জানান স্থানীয়রা।
মহিষখোলা সার্বজনীন পূজামন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক শুভংকর সরকার বলেন, এ এলাকায় মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি হলেও কখনো পূজা-অর্চনা করতে কোনো সমস্যার মুখোমুখি হইনি। ধর্ম নিয়ে আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। প্রত্যেকেই নিজের ধর্ম পালনের পাশাপাশি অন্য ধর্মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল।
মহিষখোলা পুরাতন সাব-রেজিস্ট্রি জামে মসজিদের ইমাম ইনামুল ইসলাম বলেন, পাশাপাশি মসজিদ-মন্দিরে নামাজ ও পূজার্চনা পালনে অতীতে কোনো সমস্যা হয়নি। ভবিষ্যতেও এ সম্প্রীতি বজায় থাকবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ইস্রাফিল খবির রাজু এশিয়া পোস্টকে বলেন, নামাজের সময় মন্দির কমিটি তাদের কার্যক্রম সীমিত রাখে। নামাজ শেষ হলে স্বাভাবিক নিয়মে পূজা-অর্চনা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা চলে। এ নিয়ে কখনো দ্বন্দ্ব-সংঘাত হয়নি। আমরা সবাই মিলেমিশে বসবাস করছি।
মহিষখোলার এই সহাবস্থানের পাশাপাশি নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় নিশিনাথতলা মন্দির ও পুলিশ ফাঁড়ি জামে মসজিদ এবং পুলিশ লাইন জামে মসজিদ ও সর্বমঙ্গলা মন্দিরও পাশাপাশি অবস্থিত। এসব স্থানে নিজ নিজ ধর্মীয় রীতি অনুসরণের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির চর্চা অব্যাহত রয়েছে।
