সুনামগঞ্জ/রাতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা, দুপুরে সংঘর্ষে জড়াল পাঁচ গ্রাম

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে ইজিবাইকে ক্রিকেট খেলার বল লাগাকে কেন্দ্র করে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির জের ধরে মসজিদের মাইকে পূর্ব ঘোষণা দিয়ে ৫ গ্রামের লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।
এ সময় ২০-৩০টি বাড়িঘর ও ৪টি দোকান ভাঙচুর এবং একটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা।
বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে তাহিরপুর উপজেলা সদরের মধ্য তাহিরপুর গ্রামে তাহিরপুর-জামালগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনের সড়কে ঘণ্টাব্যাপী এ সংঘর্ষ চলে। পরে আশপাশের গ্রামের বাসিন্দা ও পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পুনরায় সংঘর্ষের আশঙ্কায় এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন আগে বীরজয় লক্ষ্মী ধুতমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গ্রামের ছেলেরা ক্রিকেট খেলছিল। এ সময় পাশের সড়ক দিয়ে যাওয়ার সময় মধ্য তাহিরপুর গ্রামের জালাল মিয়ার ইজিবাইকের ওপর একটি ক্রিকেট বল এসে পড়ে। এ নিয়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের হাফিজ মিয়ার সঙ্গে খেলোয়াড়দের বাগ্বিতণ্ডা ও হাতাহাতি হয়। এর জেরে ওই দিন বিকেলে তাহিরপুর বাজারে ধুতমা গ্রামের জসিম উদ্দিনকে মধ্য তাহিরপুরের কয়েকজন মারধর করে। পরে মঙ্গলবার হাফিজ মিয়াকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারধর করে বীরনগর গ্রামের কয়েকজন।
এসব মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। মঙ্গলবার রাতে বীরনগর গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে আজ বুধবার সকালে বীরনগর, জয়নগর, লক্ষ্মীপুর ও ধুতমা গ্রামের লোকজনকে যার যা অস্ত্র আছে তা-ই নিয়ে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হয়। মাইকিংয়ের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দুপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের চেষ্টা করেন। তবে রাতে উত্তেজনা কমেনি এবং ঘটনার কোনো সুরাহা হয়নি।
পরবর্তী সময়ে আজ বুধবার দুপুরে ওই চার গ্রামের লোকজন দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামে হামলা চালায় এবং বাড়িঘর ও দোকানপাট ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের আলকাছ মিয়ার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হলে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। এ সময় মধ্য তাহিরপুরের লোকজন প্রতিরোধ গড়ে তুলে পাল্টা আক্রমণ করলে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন।
মধ্য তাহিরপুর গ্রামের বাসিন্দা তানিম আহমদ লিংকন ও রহিমা বেগম বলেন, তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে গতকাল রাতে বীরনগর গ্রামের মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল আজ সকালে আমাদের গ্রামে হামলা করা হবে। এরপর আজ দুপুরে হঠাৎ চার গ্রামের হাজারো মানুষ নৌকা নিয়ে এসে আমাদের গ্রামে হামলা চালায়। তারা বাড়িঘর ও দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাট করে, নারীদের মারধর করে এবং একটি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।
অভিযোগের ব্যাপারে বীরনগর গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল মিয়া বলেন, শিশুদের ক্রিকেট খেলার সময় ইজিবাইকে বল পড়া নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। এরপর দুপক্ষের মধ্যে মারধর ও পাল্টা মারধরের ঘটনা ঘটে। আজ দুপক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল; এলাকার লোকজন ও প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।
জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও তাহিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মারামারি থেকে আজকের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আমি বর্তমানে ঢাকায় আছি, আজকের ঘটনায় আমরা লজ্জিত। সংসদ সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের বাড়ি এই এলাকায় হলেও আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারিনি। উভয়পক্ষের অতিউৎসাহী কিছু লোকের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে এলাকার মানুষ, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ এটি রোখার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ জানান, কয়েক দিন আগের এক তুচ্ছ ঘটনার জের ধরে দুপক্ষের লোকজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। তারই ধারাবাহিকতায় আজ সংঘর্ষ ঘটে। পুলিশ চেষ্টা চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
