logo

ব্যাংক থেকে বাঁধ মেরামতের টাকা তুলে নিলেন ইউএনও অফিসের কর্মচারী

ব্যাংক থেকে বাঁধ মেরামতের টাকা তুলে নিলেন ইউএনও অফিসের কর্মচারী
তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়। ইনসেটে ইউএনওর কার্যালয়ের আউটসোর্সিং কর্মচারী এনায়েত পাটোয়ারী। ছবি : এশিয়া পোস্ট

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে হাওরের বোরো ফসলরক্ষা ডুবন্ত বাঁধ মেরামত প্রকল্পের আনুষঙ্গিক ব্যয়ের জন্য ইস্যু করা একটি চেকের ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৯ টাকা উত্তোলনের ঘটনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। চেকের টাকা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও চেকের নামে উল্লেখিত ব্যক্তির অগোচরে উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ের দুই কর্মচারীর নাম আলোচনায় এসেছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে।

গত ৭ অক্টোবর তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ করেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তাহিরপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা কর্মকর্তা ও উপজেলা কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) প্রকল্প বাস্তবায়ন ও মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব উপসহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন। অভিযোগে সরকারি অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সংশোধিত ‘কাবিটা নীতিমালা ২০২৩’-এর আওতায় তাহিরপুর উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত ডুবন্ত বাঁধ মেরামতের ব্যয় থেকে আনুষঙ্গিক খরচ বাবদ ১ শতাংশ অর্থ বরাদ্দের অংশ হিসেবে গত ২৮ জুন ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৮৯ টাকার একটি চেক প্রস্তুত করা হয়। স্টেশনারি সামগ্রী কেনা, আপ্যায়নসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে চেকটি ইস্যু করা হয়েছিল। চেকটির নম্বর ০৯৩০০৯৮।

অভিযোগে মনির হোসেন উল্লেখ করেন, উপজেলা কাবিটা কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে তিনি চেকটিতে স্বাক্ষর করে কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার স্বাক্ষরের জন্য পাঠান। ইউএনওর স্বাক্ষর নেওয়ার পর চেকটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের শাখা কার্যালয়ে দাপ্তরিক কাজে জমা দেওয়ার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বিশ্বজিৎ সূত্রধরের কাছে রাখা হয়। পরে চেকটি অফিসে জমা দেওয়ার বিষয়ে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি তা জমা দেননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।

মনির হোসেন জানান, গত ৬ অক্টোবর কাবিটা প্রকল্পের চলতি হিসাবের (হিসাব নম্বর: ৫৯১১৩০২০০০৬৪০) বিবরণী সোনালী ব্যাংকের তাহিরপুর শাখা থেকে সংগ্রহ করে তিনি জানতে পারেন, ০৯৩০০৯৮ নম্বর চেকের বিপরীতে গত ২০ সেপ্টেম্বর টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। এতে ব্যাংক হিসাবের বিবরণী ও বিল রেজিস্টারের মধ্যে অমিল দেখা দেয়। এ ঘটনায় সরকারি অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চেকটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তাহিরপুর কার্যালয়ের কার্যসহকারী জিলানী মিয়ার নামে ছিল। তবে তিনি চেকের টাকা উত্তোলন করেননি বলে জানিয়েছেন। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউএনওর কার্যালয়ের আউটসোর্সিং কর্মচারী এনায়েত পাটোয়ারী চেকটির টাকা উত্তোলন করেছেন।

সোনালী ব্যাংক পিএলসির তাহিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক অর্পণ যাত্রা বলেন, বেয়ারার চেক নিয়ে যে কেউ ব্যাংকে এলে টাকা উত্তোলন করতে পারেন। পরিচিত কেউ এলে আমরা বেয়ারার চেকের টাকা দিয়ে থাকি। ইউএনও অফিসের স্টাফ এনায়েত পাটোয়ারী এই চেকের টাকা উত্তোলন করেছেন। তিনি ইউএনও অফিসের স্টাফ—এই পরিচয়েই আমরা টাকা দিয়েছি।

এদিকে চেকের টাকা উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে এনায়েত পাটোয়ারীর বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। তার মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউএনওর কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক বিশ্বজিৎ সূত্রধর। তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের চেকের বিষয়ে উপসহকারী প্রকৌশলী ভালো জানেন। অন্যের নামে করা চেকের টাকা আমার উত্তোলন করার সুযোগ নেই। অভিযোগ করা হয়েছে, এখন ইউএনও স্যার তদন্ত করবেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তাহিরপুরের দায়িত্বপ্রাপ্ত শাখা কর্মকর্তা মনির হোসেন বলেন, ব্যাংক ব্যবস্থাপক তাকে জানিয়েছেন, ইউএনওর কার্যালয়ের কর্মচারী এনায়েত পাটোয়ারী চেকটির টাকা উত্তোলন করেছেন। এ বিষয়ে ইউএনওর সঙ্গে তার কথা হয়েছে। পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য তিনি তাহিরপুরে যাবেন বলেও জানান।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রিপামনি দেবী বলেন, টাকা উত্তোলনের ঘটনাটি তার যোগদানের আগের। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেন এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। চেকটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে থাকার কথা থাকলেও কীভাবে অন্য ব্যক্তি তা দিয়ে টাকা তুলেছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ব্যবস্থাপকও অন্য ব্যক্তিকে এভাবে টাকা দিয়ে সঠিক কাজ করেননি। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত চলছে। দ্রুত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য উপজেলা সমবায় কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তাহিরপুরের সাবেক ইউএনও ও বর্তমানে চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেহেদী হাসান মানিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের চেক পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেনের কাছে থাকত। চেকের টাকা কে উত্তোলন করেছেন, তা তিনি বলতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, বদলি হয়ে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। লিখিত অভিযোগ করা হয়ে থাকলে বর্তমান ইউএনও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।