logo

আলু চাষে ঋণ, জমি বেচে শোধ

আলু চাষে ঋণ, জমি বেচে শোধ

গত বছরের লোকসান কাটিয়ে ওঠার আশায় আলু চাষ করে এবারও ধাক্কা খেয়েছেন বগুড়ার কৃষকরা। লাভ তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে চাষের খরচই উঠছে না। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক নামমাত্র মূল্যে আলু বিক্রি করছেন, কেউ কেউ গবাদিপশুর খাদ্য হিসেবে জমিতেই আলু দিয়ে দিচ্ছেন। ঋণের বোঝা সামলাতে অনেককে জমি পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। কৃষকদের দাবি, সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ নেই।

বগুড়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে আলু চাষে ব্যাপক লোকসান হয়েছে। বাজারে এস্টরিক্স জাতের আলু বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি প্রায় ৩৬০ টাকায়। আগাম জাতের আলুর অবস্থা আরও খারাপ ছিল; অনেক কৃষককে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা মণ দরে আলু বিক্রি করতে হয়েছে।

জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, বগুড়ায় আলুর সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ৩ লাখ টন। অন্যদিকে সারা দেশে আলুর চাহিদা ৭০ থেকে ৮০ লাখ টনের মধ্যে হলেও উৎপাদন হয় প্রায় সোয়া কোটি টন। পরিকল্পনা ছাড়া চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত আবাদ ও উৎপাদনের কারণে কৃষকদের এই ভোগান্তি তৈরি হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে জেলায় ৫৫ হাজার ৬০ হেক্টর জমির বিপরীতে ৬০ হাজার ৪৩৫ হেক্টর জমিতে আলুর আবাদ হয়েছিল। এতে উৎপাদন হয় ১৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭৭০ টন। চলতি বছর ৫৪ হাজার ৪৬৫ হেক্টর জমিতে একই পরিমাণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। তবে এখনো প্রায় ৫০ শতাংশ আলু মাঠেই পড়ে আছে।

বগুড়া সদরের শাখারিয়া ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, অনেক কৃষক আলু জমিতেই ফেলে রেখেছেন। আলু চাষ করতে গিয়ে তারা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন, অনেকে ঋণ শোধ করতে জমি পর্যন্ত বিক্রি করেছেন।

শাখারিয়া ইউনিয়নের বাউলাপাড়া গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন প্রায় ৩৫ বছর ধরে আলু চাষের সঙ্গে যুক্ত। তিনি জানান, গত বছর ৫৫০ বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতি কেজিতে ১ টাকা লোকসান দিয়ে আলু বিক্রি করতে হয়েছে।

এবার ঘুরে দাঁড়ানোর আশায় দোকান থেকে সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বাকি নিয়ে ৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেন তিনি। প্রতি বিঘায় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা খরচ হলেও বর্তমানে বিঘাপ্রতি আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকায়। গত ৩৫ বছরের কৃষিজীবনে আলুর দামে এমন পতন তিনি কখনো দেখেননি।

দেলোয়ার হোসেন বলেন, ফলন ভালো হয়েছে, কিন্তু আলু নেওয়ার মতো মানুষ নেই। তাই জমি থেকে আলু তুলেও আনিনি। অনেকেই গরুকে খাওয়ানোর জন্য জমি থেকে আলু নিয়ে যাচ্ছে। এই আলু মণপ্রতি মাত্র ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, ধারদেনা বেড়ে যাওয়ায় দোকানে সার ও কীটনাশকের টাকা বাকি রয়েছে। সংসার চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে কিছুদিন আগে ২০ শতক জমি ২ লাখ টাকায় ইজারা দিয়ে সেই টাকা দিয়ে ঋণ শোধ করেছেন।

প্রতিবেশী কৃষক মোসলেম উদ্দিন প্রামাণিক প্রায় ৪৫ বছর ধরে আলু চাষ করছেন। তিনি বলেন, গত বছরের লোকসানের পর আশা ছিল এবার আলুর দাম বাড়বে। কিন্তু আলু যে এভাবে ধ্বংস করে দেবে, তা ভাবিনি। বীজ, সার, কীটনাশক ও সেচের খরচই উঠেনি। ঋণের চাপ সামলাতে তিনি ৬ শতক জমি ৪ লাখ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন।

মোসলেম উদ্দিন বলেন, আলু বিক্রি করে এখন আর আমাদের পেটের ভাত হচ্ছে না, বরং ভাত কেড়ে নিচ্ছে।

বগুড়া সদরের শাখারিয়া এলাকার কৃষক রাজু আহম্মেদ সাড়ে ৮ বিঘা জমিতে আগাম জাতের আলু চাষ করে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ঋণে পড়েছেন। পৈত্রিক জমিতে চাষ করা এই কৃষক এখন সংসার চালাতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালাচ্ছেন।

তিনি বলেন, এভাবে চলতে থাকলে একসময় কৃষকরা ঋণের চাপে আত্মহত্যা শুরু করবে। আমিও ঋণের মধ্যে পড়ে গেছি। এখন গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতে হচ্ছে।

বগুড়ার অন্যান্য এলাকাতেও কৃষকদের অবস্থা একই রকম। তার ওপর সাম্প্রতিক কয়েক দিনের বৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। শিবগঞ্জ উপজেলার অনেক এলাকায় আলুর জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।

বুড়িগঞ্জ এলাকায় কৃষক আব্দুল জলিল কাদাপানির মধ্যে দাঁড়িয়ে আলু তুলছিলেন। তিনি বলেন, দুই বিঘা জমিতে আলু করেছিলাম। দাম নেই, প্রচুর লোকসান। বৃষ্টির কারণে আরও ক্ষতি হয়েছে। পানিতে আলু তোলা যায় না, পচে যাচ্ছে।

বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকাজ করেন বগুড়া সদরের মাটিডালী এলাকার আইনুল হক। তিনি প্রতি বছর ৫ থেকে ৭ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেন।

আইনুল হক বলেন, আমাদের জমিগুলো তিন ফসলি। সাধারণত একটি ফসলের লাভ অন্যটির লোকসান পুষিয়ে দেয়। কিন্তু এবার আলুর লোকসান এত বেশি যে, অন্য ফসলের লাভ দিয়েও তা পূরণ হচ্ছে না। এতে কৃষকের নিঃস্ব হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তিনি মনে করেন, সার ও কীটনাশকের সিন্ডিকেট ভাঙা এবং আলু রপ্তানির সুযোগ বাড়ানো জরুরি।

বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (ক্রপ) মো. মাহফুজ আলম বলেন, দেশে চাহিদার তুলনায় আলু উৎপাদন অনেক বেশি। কিন্তু রপ্তানি সীমিত এবং আলু থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত পণ্য তৈরির উদ্যোগও কম। এসব কারণে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব।