logo

৪ লাখ টাকা খরচ করে দেশে এসে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করলেন প্রবাসী

রাকিবুল হাসান রোকেল
কিশোরগঞ্জ
৪ লাখ টাকা খরচ করে দেশে এসে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করলেন প্রবাসী
সৌদি প্রবাসী সবুজ মিয়া। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মো. সবুজ মিয়া (৪০) চার বছর ধরে সৌদি আরবে বসবাস করছেন। হঠাৎ জানতে পারেন, বাংলাদেশের সরকারি নথিতে তিনি ‘মৃত’। নথিতে মৃত হয়ে যাওয়ার সেই ভুল সংশোধন করে নিজেকে জীবিত প্রমাণ করতে শেষ পর্যন্ত দেশে ফিরতে হয়েছে তাকে। এ প্রক্রিয়ায় ভোগান্তির পাশাপাশি তাকে গুনতে হয়েছে চার লাখ টাকার বেশি।

জানা যায়, সবুজ মিয়ার বাড়ি কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গৌবিন্দপুর ইউনিয়নের উত্তর মাথখলা গ্রামে। তিনি ২০২২ সৌদি আরব যান। সেখানে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর অনলাইনে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে সবুজ জানতে পারেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, সরকারি ভোটার তালিকায় তিনি মৃত।

এনআইডি সচল করতে হোসেনপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করেন সবুজ। সেখান থেকে তাকে জানানো হয় নিজেকে জীবিত প্রমাণিত করতে হলে তাকে দেশে আসতে হবে। পরে চলতি বছর ২৫ জুলাই সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন তিনি। নতুন করে আঙুলের ছাপ দিয়ে ভোটার তথ্য হালসাগাদ করেন। এতে যাতায়াতসহ তার খরচ হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকার মতো।

ক্ষোভ প্রকাশ করে সবুজ মিয়া বলেন, ‘নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করলে তারা আমাকে বলে, ভুলবশত নাকি এমনটা ঘটেছে। তাদের ভুলের কারণে আমার পকেট থেকে খসে গেছে চার লাখ টাকা। আমাকে যে ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে মৃত দেখানোর কারণে পাসপোর্ট নবায়ন করতে পারিনি। পরে এটা ঠিক করতে গত ২৫ জুলাই দেশে এসেছি। আগামী ১০ অক্টোবর আবার সৌদি ফিরতে হবে। সেটার খরচও আমার পকেট থেকেই হবে। এত বড় ভুলের দায় কে নেবে?

তবে জানা গেছে, কোন ব্যক্তি বা কার আবেদনের ভিত্তিতে তাকে মৃত দেখানো হয়েছিল, সেই আবেদন বা কোনো প্রমাণই এখন নির্বাচন অফিসে নেই। এমনকি সবুজ মিয়ার ভোটার কর্তনের মূল আবেদনটিও খুঁজে পাচ্ছে না সংশ্লিষ্ট অফিস।

সবুজ মিয়া একা নন। কিশোরগঞ্জে ভোটার তালিকায় জীবিত মানুষকে মৃত দেখিয়ে নাম কর্তনের এমন ঘটনা ঘটেছে আরও অনেকের ক্ষেত্রে।

নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদে কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় মোট ৪৬ হাজার ৬২২ জন ভোটারকে ‘মৃত’ দেখিয়ে তালিকা থেকে কর্তন করা হয়। এর মধ্যে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত আবেদন করে অন্তত ২২২ জন নিজেদের জীবিত প্রমাণ করে ভোটার তালিকায় পুনর্বহাল হয়েছেন। এর মধ্যে হোসেনপুরেই আবেদন জমা পড়েছে ২৮টি।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভোটারের নাম মৃত হিসেবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে হলে পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তথ্য সংগ্রহকারী শিক্ষক এবং সুপারভাইজারের মাধ্যমে কয়েক ধাপে তা যাচাই করার কথা।

কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কোথাও ভুয়া আবেদনকারী, কোথাও ভুল তথ্য, আবার কোথাও জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ রয়েছে। আর সবুজ মিয়ার ক্ষেত্রে কর্তনের মূল আবেদন নির্বাচন অফিসে পাওয়া যাচ্ছে না।

উত্তর মাথখলা এলাকায় ভোটার হালনাগাদের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, আমি যেসব মৃত ভোটারের তথ্য কর্তনের জন্য পাঠিয়েছি সবার পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় ইউপি সদস্যের সিল ও স্বাক্ষর নিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন জমা দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, সবুজ মিয়ার ক্ষেত্রে যদি কোনো আবেদনই সার্ভারে না থাকে, তাহলে এর দায় নির্বাচন অফিসের। আর আবেদন থেকে থাকলে কার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভোটার কর্তন করা হয়েছে, তা নথিতে স্পষ্ট থাকার কথা।

হোসেনপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আলিমুল রাজী বলেন, কর্তন করা ভোটারের ক্ষেত্রে ১২ নম্বর ফরম সংযুক্ত থাকার কথা। কিন্তু সবুজ মিয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো আবেদন বা তথ্য পাওয়া যায়নি। অনলাইনেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অফিসেও কোনো কাগজপত্র নেই।

তবে তিনি জানান, সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় তিনি ওই কর্মস্থলে ছিলেন না। সম্প্রতি হোসেনপুরে যোগদান করেছেন। বিষয়টি নিয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদের সময় হোসেনপুর উপজেলা নির্বাচন অফিসে কর্মরত থাকা ওসমান গণির সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভোটারের তথ্য নির্বাচন অফিসে না থাকলে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তাকে সবুজ মিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর জানানো হলে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা আমি আগে কখনো শুনিনি।

কিশোরগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোরশেদ আলম বলেন, মাঠপর্যায় থেকে কোনো ব্যক্তি ভুল তথ্য দিলে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচন অফিসের কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসাধু পন্থা অনুসরণ করে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিশোরগঞ্জের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অশোক সরকার বলেন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোনো জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়ে থাকলে তা ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে গিয়ে কিশোরগঞ্জে অন্তত ২২২ জন জানতে পেরেছেন, সরকারি নথিতে তাদের মৃত দেখানো হয়েছে। পরে আবেদনের মাধ্যমে তারা জীবিত হিসেবে পুনর্বহাল হয়েছেন। হালনাগাদ কার্যক্রমে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কমে আসতে পারে। এ জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি তদন্তেরও পরামর্শ দেন তিনি।