logo

লোভের ফাঁদে তামাক চাষ, বাড়ছে ঝুঁকি

লোভের ফাঁদে তামাক চাষ, বাড়ছে ঝুঁকি

লাভের নিশ্চয়তা ও সহজ শর্তের প্রলোভনে মানিকগঞ্জে ক্রমেই বাড়ছে তামাক চাষ। বিকল্প ফসলের অনিশ্চিত বাজারের তুলনায় তামাক কোম্পানির সরাসরি সম্পৃক্ততা কৃষকদের এই চাষে আগ্রহী করে তুলছে। তবে এতে যেমন কৃষিজমির উর্বরতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকিও।

জেলার সদর, সাটুরিয়া, ঘিওর ও দৌলতপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দৃশ্যমানভাবে তামাক চাষের বিস্তার ঘটেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে প্রায় ৩৫৫ হেক্টর জমিতে তামাকের আবাদ হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

সদর উপজেলার গড়পাড়া ইউনিয়নের দক্ষিণ উথলী গ্রামের কৃষক মো. কালাম প্রায় দুই দশক ধরে তামাক চাষ করছেন। এ বছরও ১২ বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন। 
তিনি বলেন, ক্ষতিকর দিক জানা থাকলেও তামাক ছাড়া অন্য ফসলে এ পরিমাণ লাভ পাওয়া কঠিন। চাষের শুরুতেই কোম্পানি থেকে বীজ, সার ও অর্থ সহায়তা মেলে, আর বিক্রিরও নিশ্চয়তা থাকে।

একই এলাকার কৃষক রহমান বলেন, নিজের ও বর্গা জমি মিলিয়ে প্রায় ৪ বিঘায় তামাক চাষ করেছেন। চুক্তিভিত্তিক হওয়ায় বিক্রির ঝামেলা নেই, নির্ধারিত সময়েই কোম্পানি ফসল কিনে নেয়। সাটুরিয়ার তিল্লী এলাকার কৃষক দেওয়ান জানান, তাদের এলাকায় তামাক চাষ অনেকটা প্রথায় পরিণত হয়েছে। অধিকাংশ কৃষকই কোনো না কোনোভাবে এই চাষের সঙ্গে যুক্ত, কারণ লাভ তুলনামূলক বেশি। তিনি বলেন, কোম্পানির প্রতিনিধিরা নিয়মিত মাঠে এসে পরামর্শ দেন, যা অন্য ফসলে পাওয়া যায় না।

তবে এই লাভের আড়ালে রয়েছে শ্রমিকদের কষ্ট ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। সাটুরিয়ার শ্রমিক সোহেল মিয়া বলেন, সারাদিন তামাক পাতা সংগ্রহ ও বহনের কাজ করতে গিয়ে শরীরে জ্বালা ও মাথা ঘোরা অনুভব করেন। একইভাবে শামসুল জানান, সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার করা প্রয়োজন হলেও গরমের কারণে তা ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

নারী শ্রমিক নারগিস বেগম বলেন, তামাক পাতার রস শরীরে লাগলে অস্বস্তি ও বমিভাব হয়। তবুও জীবিকার তাগিদে এই কাজ করতে হচ্ছে, কারণ মৌসুমে বিকল্প কাজের সুযোগ কম।

পরিবেশবিদদের মতে, তামাক চাষের প্রভাব শুধু মানুষের শরীরেই নয়, জমি ও পরিবেশেও পড়ছে। পরিবেশকর্মী বিমল চন্দ্র রায় বলেন, তামাক চাষে জমির উর্বরতা কমে যায়, ফলে পরবর্তীতে অন্য ফসল উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া তামাক শুকানোর সময় নির্গত গন্ধ পরিবেশদূষণের কারণ হয়।

মানিকগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার এবিএম তৌহিদুজ্জামান সুমন জানান, তামাকের সংস্পর্শে থাকা শ্রমিকদের শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের জটিল রোগ এমনকি ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়ে।

এদিকে কৃষি বিভাগ বলছে, তামাক চাষ নিরুৎসাহিত করতে তারা কাজ করছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাহজাহান সিরাজ বলেন, কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং তামাকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন করা হচ্ছে। পাশাপাশি আখ, কলাসহ বিকল্প লাভজনক ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।