জামালপুর/ভাঙন তাণ্ডবে নিঃস্ব শত পরিবার, দিশেহারা নদীপাড়ের মানুষ

জামালপুরে যমুনা, জিঞ্জিরাম ও দশআনি নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গত এক সপ্তাহে নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। এতে ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলার শত শত পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইসলামপুরের ডেবরাইপ্যাচ, বকশীগঞ্জের কুতুবের চর ও বাঙ্গালপাড়া এবং দেওয়ানগঞ্জের চরডাকাতিয়াপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। ঘরবাড়ি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার আগেই মানুষ আসবাবপত্র ও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন।
ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হওয়াদের একজন ষাটোর্ধ্ব রোফ হোসেন। জীবনের দীর্ঘ সময় স্ত্রী ও চার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কাটিয়েছেন জামালপুরের ইসলামপুরের ডেবরাইপ্যাচ এলাকার পৈতৃক ভিটায়। কিন্তু সম্প্রতি আগ্রাসী যমুনা কেড়ে নিয়েছে তার জীবনের সব স্মৃতি, যেখানে কেটেছে শৈশব আর বৃদ্ধ বয়সের শেষ ঠিকানা। শেষ চেষ্টা হিসেবে কয়েকটি বাঁশ আর গাছ ফেলে ঘরটা বাঁচাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পানির তীব্র স্রোতের কাছে হেরে গেছেন এই বৃদ্ধ।

রোফ হোসেন বলেন, বাপ-দাদার এই ভিটায় জীবনের শেষ সময়টা পার করতে চেয়েছিলাম। চোখের সামনে ঘরডা নদী লইয়া গেল, কিচ্ছু করতে পারলাম না। এহন কই যামু, আমাদের তো যাওয়ার কোনো ঠিকানা নাই! এই নদীই সব খাইয়া ফালাইলো। আমাদের আর কিছুই থাকলো না।
শুধু রোফ হোসেন নন, একই বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার খোলাবাড়ী এলাকার আব্দুল হকও। জীবনে সাতবার নদীভাঙনের শিকার হয়েছেন তিনি। এবার অষ্টমবারের মতো ভাঙনের মুখে পড়েছে তার মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকুও। পাঁচ সন্তানের কেউ পাশে নেই, তাই একা একাই সরাচ্ছেন নিজের ঘর। কথা বলতে বলতে আব্দুল হকের কণ্ঠ ভারী হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, আমাদের সব জমিজমা নদীতে চলে গেছে। আমাদের এখন আর কিছু নেই, সব নদীতে চলে গেছে। সরকারের উচিত আমাদের একটু সাহায্য করা। এত দিন ধরে নদী ভাঙতাছে, কেউ কিছু করে না।
একই দুর্দশার শিকার হয়েছেন ৫৩ বছর বয়সী বিধবা রহিমা বেগম। দুইবার ভাঙনের পর যমুনার পাড়ে নতুন করে গড়ে তুলেছিলেন ছোট্ট একটি ঘর। সম্প্রতি সেই শেষ আশ্রয়টুকুও নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
নদীপাড়ের বাসিন্দা হৃদয় বলেন, ‘নদী আমাগো সব শেষ করে দিতাছে। ভাঙন ঠেকাতে মেম্বার-চেয়ারম্যানগোসহ কত জায়গায় দৌড়াদৌড়ি করছি, কিন্তু কেউ কোনো স্থায়ী সমাধান দেয় নাই। যখন ভাঙে তখন কয়েকটা আইসা বস্তা ফালাইয়া যায়। স্থায়ী সমাধান কেউ করে না। আমরা ত্রাণ চাই না, আমরা আমাগো ভিটা বাঁচানোর জন্য বাঁধ চাই।’

শিক্ষার্থী শামীম বলেন, আমাদের নির্বাচনের সময় নেতাদের দেখা গেছে। এখন নির্বাচন শেষ, আমাদের কোনো খোঁজখবর নিচ্ছে না, এমনকি কোনো আশ্বাসও দিচ্ছে না। আমরা চাই আমাদের যে নাগরিক অধিকার—আমাদের অস্তিত্ব বিলীন হওয়া থেকে রক্ষা করা হোক। আমরা চাই সরকার নদীভাঙন রোধ করে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দিক।
এ বিষয়ে জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান খান বলেন, জামালপুরের বেশ কয়েকটি পয়েন্টে পানি বাড়ার কারণে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। ভাঙনকবলিত এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে জিওব্যাগ ফেলাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। স্থায়ীভাবে ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় প্রকল্প গ্রহণের বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
