logo

রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়ে বামং খিয়াং বললেন/‘দুর্গম এলাকার কোনো শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হোক’

মো. জামাল উদ্দীন
থানচি, বান্দরবান
‘দুর্গম এলাকার কোনো শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হোক’
প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের হাত থেকে সম্মাননাপত্র বুঝে নিচ্ছেন শিক্ষক বামং খিয়াং মিলেন। সোমবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

পাহাড়ের দুর্গম এলাকার কোনো শিশু যেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়–এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বিশ্ব শিক্ষক দিবসে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়া বামং খিয়াং মিংলেন। তিনি বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বামং খিয়াং মিংলেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন এবং পরিচালন ব্যয় মেটাতে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে আয় করেন।

সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের ১০২ জন গুণী শিক্ষকের সঙ্গে তাকেও সম্মাননা দেওয়া হয়েছে।

রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নির্বাচিত ১০২ জন গুণী শিক্ষকের হাতে সম্মাননাপত্র তুলে দেওয়া হয়। সম্মাননাপত্রের সঙ্গে প্রত্যেককে দেওয়া হয় দুই লাখ টাকা ও ক্রেস্ট।

তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের সাতজন শিক্ষকের তালিকায় স্থান পান দুর্গম পাহাড়ি জনপদের শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন।

সম্মাননা পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে বামং খিয়াং মিংলেন বলেন, এই সম্মান শুধু আমার একার নয়। এটি তিন্দুর শিক্ষার্থী, অভিভাবক, সহকর্মী এবং পুরো পাহাড়ি এলাকার মানুষের সম্মান। আমি চাই, দুর্গম এলাকার কোনো শিশু অর্থের অভাবে শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হোক।

তিনি বলেন, শিক্ষকতা শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে একজন শিক্ষককে প্রয়োজনে নিজের সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা দিয়ে পাশে দাঁড়াতে হয়।

বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদ তিন্দুতে অবস্থিত তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। ২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ৫৬ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। দুর্গম ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীর পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল। অনেক পরিবারের পক্ষে নিয়মিত বিদ্যালয়ের বেতন পরিশোধ করা সম্ভব হয় না।

একদিকে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া, অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় মেটানো ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

হাল ছাড়েননি প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ এবং সহকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি নিয়েছেন ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ছুটির দিনগুলোতে থানচি-তিন্দু-রেমাক্রী নৌপথে ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালান বামং খিয়াং মিংলেন। পর্যটক ও স্থানীয় যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি ব্যয় করেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ এবং বিদ্যালয়ের বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় মেটাতে।

দিনের বেলায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান, ছুটির দিনে নদীতে নৌকা চালিয়ে বিদ্যালয়ের খরচ জোগাড় করা তার জীবনের এক অনন্য সংগ্রামের গল্প হয়ে উঠেছে।

বামং খিয়াং মিংলেনের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে তা দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। একজন প্রধান শিক্ষক নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে নৌকা চালাচ্ছেন, এমন ঘটনা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

বিষয়টি সরকারের নজরেও আসে। গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদ অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়া গেছে এবং বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

এ ঘোষণাকে দুর্গম তিন্দু এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বড় ধরনের আশার খবর হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনসংকট কমার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার পরিবেশ আরও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্মাননা পাওয়ায় বামং খিয়াং মিংলেনকে নিয়ে গর্বিত তিন্দুর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার সংকট দূর করতে একজন শিক্ষক কতটা দায়িত্বশীল ও আত্মত্যাগী হতে পারেন, তার কর্মকাণ্ড তারই উদাহরণ।

শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা যেন বেতনসংকটে না পড়েন এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়, সে চিন্তা থেকে নৌকা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। শিক্ষকতা আমার পেশা, এই বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আমার দায়িত্ব।

তিনি জানান, দুর্গম এলাকার দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের জন্য বিদ্যালয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থের অভাবে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, তিনি তা চাননি। নিজের শ্রম দিয়ে হলেও বিদ্যালয়টি চালু রাখার চেষ্টা করছেন।