
ভোরে আলো ফোটার সাথে সাথেই নওগাঁর পোরশা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী নিতপুর ঘাটে শুরু হয় জেলেদের হাঁকডাক। সারা রাত সীমান্তঘেঁষা পুনর্ভবা নদী থেকে ধরে আনা গুচি, বাইম, আইড়, বোয়াল, টেংরা, পাবদা ও দেশি শোল-টাকির মতো দেশীয় সুস্বাদু মাছের পসরা নিয়ে ঘাটে ভিড়তে থাকে সারি সারি নৌকা। ঘাট থেকে দ্রুত বাছাই করে তাজা মাছ নিয়ে যাওয়া হয় নিতপুর পুরাতন বাজারে, যেখানে পাইকারি ও খুচরা ক্রেতাদের দরদামের প্রতিযোগিতায় জমে ওঠে ভোরের বেচাকেনা।
পুনর্ভবা নদীর তাজা মাছের অনন্য স্বাদের কারণে প্রতিদিন ভোরেই নিতপুর বাজারে সাধারণ ক্রেতা ও দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। এই বাজার থেকে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে মাছ চলে যায় আশপাশের এলাকার বিভিন্ন আড়তেও।
ঘাটের জেলে আব্দুস সালাম এশিয়া পোস্টকে জানান, পুনর্ভবা নদীর মাছের স্বাদ ও চাহিদা সবসময়ই আলাদা। সারা রাত নদী থেকে মাছ ধরে ভোরে নিতপুর ঘাটে এনে তারা তা বাছাই করেন। পুরাতন বাজারে নিয়ে যাওয়ার পরপরই ক্রেতা ও পাইকাররা প্রতিযোগিতা করে তা কিনে নেন। নদীর তাজা মাছের এই ঘাটের আনাগোনা এবং নিতপুর পুরাতন বাজারের জমজমাট বেচাকেনা স্থানীয় মৎস্যজীবী ও ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা আনার পাশাপাশি স্থানীয়দের জন্য তাজা মাছের নির্ভরযোগ্য ভরসাস্থল হিসেবে পরিচিতি ধরে রেখেছে।
আরেক জেলে লিটন জানান, ভোরের দিকে নদীতে মাছের আনাগোনা বেশি থাকে। ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা পুনর্ভবা নদীতে দেশীয় মাছের বিচরণও তুলনামূলক বেশি। তিনি ও তার দল দীর্ঘ সময় ধরে নদী থেকে মাছ শিকার করে ঘাটে আসেন। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ কেজি মাছ ধরে থাকেন তারা। এই মাছ বিক্রির মাধ্যমেই তাদের সংসার-সংগ্রামের চাকা সচল থাকে। মূলত মাছ ধরা এবং তা বাজারে বিক্রি করেই তাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ হয়।
কোন মাছের দাম কত
স্থানীয় ক্রেতা ও পাইকারদের আনাগোনায় মুখরিত এই ঘাটে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ নির্ধারিত দামে বিক্রি হয়ি। পাইকারি ও খুচরা বাজারের দরদাম অনুযায়ী, সরপুঁটি ১৮০–২০০ টাকা, ছোট পুঁটি ৪০–৮০ টাকা, বাইম ৪০০–৭০০ টাকা, আইড় প্রকারভেদে ৩০০–৪০০ টাকা, বোয়াল ওজনভেদে ৩৫০–৬০০ টাকা, টেংরা ৩৫০–৫০০ টাকা, পাবদা ২০০–২৫০ টাকা, ছোট চিংড়ি ৫০০–৮০০ টাকা এবং শোল, টাকিসহ অন্যান্য ছোট মাছ ১৫০–৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সাপাহার থেকে আসা পাইকারি মাছ ব্যবসায়ী স্বাধীন হোসেন জানান, ফজরের আজানের আগে থেকে তারা ঘাটে এসে মাছ কেনার জন্য বসে থাকেন। এই নদীর ছোট ও বড় মাছ সুস্বাদু হওয়ায় এর চাহিদা বেশি থাকে। ঘাট থেকে মাছ সংগ্রহ করে তারা সরাসরি পাইকারি মাছ বাজারে নিয়ে তা বিক্রি করেন।
বাড়ির জন্য মাছ নিতে আসা জামিল নামের এক ক্রেতা জানান, অল্প মাছ কেনার জন্য তারা সকালে আসেন। এখানে দেশীয় সব মাছই পাওয়া যায়, যা প্রতিদিন তার পরিবারের মাছের চাহিদা মেটায়। তিনি প্রায়ই এখান থেকে মাছ কিনে বাড়ি যান।
পোরশা সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা মো. আইয়ূব আলী এশিয়া পোস্টকে জানান, পুনর্ভবা নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে সরকার ও মৎস্য অধিদপ্তর নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এই নদীর মাছ স্থানীয় পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি মৎস্যজীবীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্থানীয় বাজারে তাজা মাছের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে মৎস্য বিভাগ সবসময় সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করে আসছে।
