২৫০ শয্যার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৯০০ রোগী

হাসপাতালের যে অবস্থা হয়েছে, দেখলে মনে হয় এটা যেন ইজতেমার মাঠ। বেডের ওপরে-নিচে, বারান্দায়, সিঁড়ির সামনে—এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে রোগী নেই। তাই আমি আমার ছেলেকে চার দিন ধরে বাসা থেকে এনে এনে চিকিৎসা নিচ্ছি। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। এখানে থাকলে রোগ আরও বাড়বে।
অতিরিক্ত রোগীর চাপে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের নাজুক অবস্থা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন সুনামগঞ্জ শহরের বড়পাড়ার বাসিন্দা মো. মিসবাহ উদ্দিন। হামে আক্রান্ত ১০ মাস বয়সী ছেলে মো. হুমাইদিকে নিয়ে চার দিন ধরে হাসপাতালে আসা-যাওয়া করছেন বলে জানান তিনি।
শুধু মিসবাহ উদ্দিনই নন, শিশু সন্তানসহ রোগী নিয়ে সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চরম অস্বাস্থ্যকর ও গিঞ্জি পরিবেশে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন শত শত রোগী। অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতালে কিছু ওষুধের সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানা গেছে।
জানা যায়, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে প্রতিদিনই ৮-৯ শতাধিক রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। গতকাল শনিবার ২৫০ শয্যার বিপরীতে সদর হাসপাতালে রোগী ভর্তি ছিলেন ৯৩০ জন। আজ রবিবার ভর্তি আছেন ৭৯৬ জন। এর মধ্যে শিশু রোগী ২১৫ জন।
হাসপাতালে ৭৪ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও ৮-৯ শতাধিক ভর্তি রোগীর চিকিৎসার জন্য বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৪ জন। অধিকাংশ চিকিৎসকের পদ ফাঁকা থাকলেও গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই হাসপাতালের সীমিত শয্যায় চিকিৎসা নিচ্ছেন ৮-৯ শতাধিক রোগী। এছাড়া প্রতিদিন কয়েক শ রোগী হাসপাতালের বহির্বিভাগে (আউটডোর) সেবা নেন। একদিকে জনবল সংকট, অন্যদিকে অতিরিক্ত রোগীর চাপ—সব মিলিয়ে হাসপাতালটি নিজেই সংকটাপন্ন অবস্থায়। যদিও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক জানিয়েছেন, চিকিৎসক-নার্সের সংকট নিয়েই সেবা দেওয়া হচ্ছে। জনবল সংকটের বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবগত করা হয়েছে।
জেলার ১২টি উপজেলার প্রায় ২৮ লাখ জনগোষ্ঠীর প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। ২০০৯ সালে ১০০ শয্যা থেকে হাসপাতালটিকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু শুরু থেকেই চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারী সংকটে ভুগছে এই হাসপাতাল।
হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ আছে ৭৪টি। কর্মরত আছেন ২৪ জন, শূন্য পদ ৫০টি। ৫০ জন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে আছেন মাত্র ১২ জন। নার্সের পদ আছে ২৬৩টি, কর্মরত আছেন ১৯৬ জন, শূন্য পদ ৬৭টি। মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ অন্যান্য কর্মীর পদ আছে আরও ১৩৬টি। এর মধ্যে ১০৮টিই শূন্য।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ভর্তি থাকা ৮-৯ শতাধিক রোগীর প্রায় অর্ধেকই শিশু। অথচ শিশু রোগের চিকিৎসক আছেন মাত্র একজন। হৃদরোগ, দন্ত, নাক-কান-গলা, চক্ষু ও হাড়-জোড়া রোগের কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকই হাসপাতালে নেই।
সরেজমিনে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের অষ্টম তলার সম্মেলন কক্ষের সামনের বারান্দা ও সিঁড়ির মুখে বেশ কয়েকজন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। পাশাপাশি বিছানায় ভর্তি শান্তিগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম বীরগাঁও ইউনিয়নের ঠাকুরভোগ গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন (১৭) ও তার ভাগ্নি তানজিনা বেগম। তাদের পাশের একই অবস্থায় মেঝেতে ভর্তি আছে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার কেজাপাড়া গ্রামের শিশু জাকারিয়া আহমদ (৯) ও একই উপজেলার রতারগাঁও এলাকার এক বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ উল্লাহ।
ঠাকুরভোগ গ্রামের আঙ্গুরা বিবি বলেন, উপায় নাই, আগে বাচ্চারার হাম অইত, এখন দেখি বড় পোলা-পানেরও এই রোগ অইতাছে। আমার ভাইপুত মিনহাজ ও নাতিন তানজিনার হাম অইছে। তারারে নিয়া সদর হাসপাতাল আইছি। কোনখানও একটা সিট খালি নাই, ওয়ার্ডের ভিতরে পাও রাখবার জায়গা নাই, বারিন্দাত লইয়া বইয়া রইছি—কি করমু?
বিশ্বম্ভরপুরের কেজাপাড়া গ্রামের শিশু জাকারিয়ার বাবা জাকির হোসেন বলেন, ছেলের হাম রোগ অইছে, চার দিন ধইরা হাসপাতাল আছি, কোনখানও একটা সিটও নাই। বারিন্দাতই আছি চাইর দিন ধইরা। ফ্যান নাই, গরমে খুব কষ্ট করাতাছি। সারা হাসপাতালে খালি রোগী আর রোগী।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার হবতপুর গ্রামের আক্তার হোসেন কষ্টের সুরে বলেন, আমার ছেলের সর্দি-জ্বর, পেটে সমস্যা এক সপ্তাহ ধরে। হাসপাতালে সিট পাইছি না, একটা ফমও (বিছানা) পাইছ না। বাড়ি থেকে কাঁথা আইন্না বারিন্দাত আছি। অসুস্থ বাইচ্ছারে লইয়াতো বাড়িত যাওয়া যাইত না। অন্য ওয়ার্ডে গিয়ে বাথরুম করা লাগে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার বড়ঘাট গ্রামের আনোয়ারুল হক বলেন, মেয়েকে নিয়ে ৮-৯ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি আছি। হাসপাতালে নাকি ওষুধ নাই। তারা খালি ইনজেকশন দেওয়ার সিরিঞ্জ দেয়, আর সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনে আনা লাগে।
সুনামগঞ্জ শহরের বাধনপাড়ার বাসিন্দা ও সুনামগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি পঙ্কজ কান্তি দে সম্প্রতি সদর হাসপাতালে গিয়েছিলেন সেবা নিতে। হতাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সদর হাসপাতাল এখন যে অবস্থায় আছে, এটি নিজেই রোগী হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় হাসপাতালের চিকিৎসা করা জরুরি। এখান থেকে কেউ কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা নিয়ে যেতে পারছেন না। কোনোভাবে মানুষকে সাময়িক সান্ত্বনা দিয়ে বিদায় করা হচ্ছে। এভাবে একটা হাসপাতাল চলতে পারে না। চিকিৎসক নিয়োগ ও শয্যা বৃদ্ধি করা না হলে এখানে যাওয়ার চেয়ে না যাওয়াই ভালো।
সদর হাসপাতালের ওষুধের স্টোররুমের দায়িত্বে থাকা সফিউল ইসলাম বলেন, শয্যার চেয়ে কয়েক গুণ রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নির্দিষ্ট পরিমাণ ওষুধ দিয়ে অধিক রোগীর সেবার কাজ চালানো হচ্ছে। ট্যাবলেটজাতীয় কোনো ওষুধের তেমন ঘাটতি নেই। অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন, দুই জাতের স্যালাইন ও প্রেসারের রোগীর কিছু ওষুধের সংকট আছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষ অবগত আছেন। এসব ওষুধ ক্রয় করার চেষ্টা চলছে।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র নার্স তানজিনা আক্তার বলেন, একটি ওয়ার্ডের ধারণক্ষমতা ৫০, কিন্তু প্রতিদিনই ২৫০-এর বেশি শিশু ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। রোগীর পাশাপাশি কয়েক গুণ স্বজন ও অভিভাবকদের কারণে সেবা দিতে কষ্ট হয়। তারপরও আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালে প্রতিদিনই ৮০০ থেকে ৯০০ বা আরও বেশি রোগী ভর্তি থাকছেন। সীমিত জনবল দিয়ে এত রোগীর সেবা দেওয়া কঠিন। ১০ জন রোগী ছাড়পত্র নিলে নতুন করে আরও ২০ জন ভর্তি হয়ে যায়। সুনামগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু না হলে এই অবস্থার উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহম্মদ হোসেন বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মচারীর সংকট রয়েছে। ২৫০ শয্যার হাসপাতালে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮-৯ শতাধিক রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। আউটডোরেও প্রতিদিন হাজারো রোগী সেবা নিচ্ছেন। ভর্তি রোগীর প্রায় অর্ধেকই শিশু। জনবল সংকট থাকলেও আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি। বেডের তুলনায় অনেক বেশি রোগী হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দেওয়া না গেলেও সেবা চলমান আছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বাথরুম ও পানি সরবরাহসহ কিছু সমস্যা রয়েছে। সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। জনবল দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলছি।


