logo

ব্যতিক্রমী এই মেলায় মেলে পছন্দের জীবনসঙ্গী

ব্যতিক্রমী এই মেলায় মেলে পছন্দের জীবনসঙ্গী
দিনাজপুরের বীরগঞ্জে আদিবাসীদের ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘মিলনমেলা’য় হাজারো মানুষের সমাগম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তরুণীদের কপালে টিপ, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক আর চুলের বেণিতে শোভা পাচ্ছে ফুলের মালা। অন্যদিকে তরুণরাও এসেছে নিজেদের মতো সেজেগুজে। বিশাল মাঠজুড়ে ঘুরে বেড়ানো আর কেনাকাটার পাশাপাশি তাদের মূল উদ্দেশ্য পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়া। মেলার ভিড়ে কাউকে পছন্দ হয়ে গেলে দুই পরিবারের আলোচনার মাধ্যমে ধুমধাম করে দেওয়া হয় বিয়ে। এমনকি বিয়ের জন্য যাবতীয় প্রসাধন ও জিনিসপত্রের পসরাও সাজিয়ে রেখেছেন বিক্রেতারা।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দেখা মিলল এমনই এক ব্যতিক্রমী মেলার। প্রায় দুই শত বছর ধরে এই মাঠে আদিবাসীদের এই মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, যা এক সময় বৌ মেলা নামে পরিচিত ছিল।

প্রতিবছর শারদীয় দুর্গাপূজার প্রতিমা বিসর্জনের পরদিন ব্যতিক্রমী এই মেলার আয়োজন করা হয়। তবে বৃহস্পতিবার গোলাপগঞ্জে সাপ্তাহিক হাট বার থাকায় এ বছর মেলাটি অনুষ্ঠিত হয় শুক্রবারে (২৩ অক্টোবর)। সকাল থেকেই দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়, নীলফামারীসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষেরা আসতে শুরু করেন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে লোকজনের সমাগম। দিনব্যাপী এই মেলায় হাজির হন হাজারও মানুষ।

কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ এই মেলায় অংশ নেন। মেলায় বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা বৌ, শাশুড়ি, ননদ ও জা-য়েরা একত্রিত হন আত্মীয়তার বন্ধন ঝালিয়ে নিতে। আর তরুণ-তরুণীরা বেছে নেন তাদের জীবনসঙ্গী।

উপজেলা আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আয়োজনে প্রায় ২০০ বছর ধরে চলে আসছে এই মেলা। পৌরাণিক প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মেলায় এসে তরুণ-তরুণীরা তাদের পছন্দের মানুষকে খুঁজে নিয়ে পরিবারকে জানান। পরবর্তীতে পরিবারের আলোচনার ভিত্তিতে বিয়ে সম্পন্ন হয়। আগের বছর মেলায় যারা জীবনসঙ্গী খুঁজে পেতেন, পরবর্তী বছর মেলায় তাদের পরিচয় সবার সামনে তুলে ধরা হতো। এখনও অনেকে পরিবারের সম্মতিতে পছন্দের পাত্র-পাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে এসে এই মেলায় বিয়ে সম্পন্ন করেন।

ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় এসে মনের মতো সঙ্গীকে খুঁজে পেয়ে খুশি তরুণ-তরুণী ও তাদের পরিবার। এই ঐতিহ্য যেন ভবিষ্যতেও বজায় থাকে এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

মেলায় আসা হরেন্দ্র রায় বলেন, এই মেলার কথা দীর্ঘদিন ধরে শুনছি, কিন্তু আসা হয়নি। এবার পুরো পরিবার নিয়ে এসেছি, মেয়েকেও সঙ্গে এনেছি। পাত্র পছন্দ হলে কথা বলব, কারণ মেয়েকে তো বিয়ে দিতেই হবে। মেলাটি ঘুরে দেখে খুব ভালো লেগেছে।

রাইসা হাসদা নামের এক তরুণী বলেন, পরিবার নিয়ে মেলায় এসেছি। এই মেলা নিয়ে অনেকের কাছে গল্প শুনেছি, আজ বাস্তবে দেখতে পেলাম। খুব ভালো লাগছে।

আরেক তরুণী স্বপ্না টুডু বলেন, এখানে অনেক মানুষের সমাগম হয়। প্রতিবছরই আসি। এখানে এলে অনেক দূর-দূরান্তের আত্মীয়-স্বজনের সাথে দেখা হয়।

বীরগঞ্জ আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি জসিম হেমরম বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে এই মেলার কথা শুনে আসছি। এটি প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো। আগে বিজয়া দশমীর পরদিনই মেলাটি বসে, তবে এবার গোলাপগঞ্জের হাটের কারণে শুক্রবার মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ২০ বছর আগে বউ মেলা নাম বদলে এর নাম মিলনমেলা রাখা হয়। দেশীয় বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী ভারত থেকেও অনেকে এই মেলায় আসেন। মেলায় এসে তরুণ-তরুণীরা নিজেদের পছন্দমতো জীবনসঙ্গী নির্বাচন করেন এবং পরে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়।