‘এক রাতেই শেষ হতে পারে সব’, হাওরে ধান বাঁচাতে কৃষকের দৌড়ঝাঁপ

বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলে তৈরি হয়েছে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। একদিকে দ্রুত বাড়ছে নদ-নদীর পানি, অন্যদিকে যে কোনো সময় ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ হাওরের বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফলে মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে কৃষকদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর হচ্ছে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, জেলার সোমেশ্বরী, কংস, ধলাই, উব্দাখালীসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি গত কয়েক দিনে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার পাহাড়ি ঢল দ্রুত নেমে এসে নিম্নাঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করছে। পানি বাড়ার এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে জেলার কলমাকান্দা, মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরি উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুম হলেও বৃষ্টির কারণে কৃষকরা মাঠে নামতে পারছেন না। যেসব ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোও ঠিকমতো শুকানো যাচ্ছে না। ফলে ধানের গুণগত মান নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বাজারমূল্য কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
খালিয়াজুরি উপজেলার হাওরপাড়ের কৃষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘ধান পুরোপুরি পেকেছে। কিন্তু বৃষ্টি থামছে না। বাঁধ ভেঙে গেলে সব শেষ হয়ে যাবে। সারা বছরের পরিশ্রম এক রাতে পানিতে চলে যেতে পারে।’
একই এলাকার আরেক কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘বাঁধের অবস্থা খুব খারাপ। কয়েক জায়গায় ফাটল ধরেছে। আমরা নিজেরা মাটি ফেলে ঠেকানোর চেষ্টা করছি, কিন্তু পানি বাড়লে আর রক্ষা হবে না।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধগুলোর অনেক অংশই দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। কোথাও কোথাও আগেই ছোট ছোট ফাটল দেখা দিয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব জায়গায় চাপ বাড়ছে, যা বড় ধরনের ভাঙনের ঝুঁকি তৈরি করছে। অতীতে এমন পরিস্থিতিতে বাঁধ ভেঙে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার একর জমির ধান তলিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। জেলায় ছোট-বড় মোট ১৩৪টি হাওর রয়েছে। আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় এ বছর ১৩৮ কিলোমিটার ডুবন্ত অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পাউবো ও উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এসব বাঁধ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ৩১ কোটি টাকা। এসব বাঁধের ওপর প্রায় ৪১ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল নির্ভরশীল।
মোহনগঞ্জ উপজেলার একটি হাওরে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকেরা ঝুঁকি নিয়েই ধান কাটার কাজে ব্যস্ত। কেউ হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে ধান কাটছেন, কেউবা কাটা ধান নৌকায় তুলে উঁচু জায়গায় নিচ্ছেন। আকাশে মেঘ জমলেই কাজের গতি বেড়ে যায়। কারণ, তারা জানেন সময় খুবই কম। ধানক্ষেতে পানি জমে যাওয়ায় ও ডিজেল সংকটে দ্রুত ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত টাকা দিয়েও পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষক নূরুল ইসলাম বলেন, ‘দিন-রাত এক করে ধান কাটছি। শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে গেছে, তবুও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সবাই নিজের জমির ধান কাটতে ব্যস্ত। এর মধ্যে বৃষ্টি হলে সব কাজ বন্ধ হয়ে যায়।’
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। কোথাও সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত মেরামতের চেষ্টা চলছে। তবে হঠাৎ করে পানির চাপ বেড়ে গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, ‘আমাদের সব আশা এই ধানের ওপর। যদি পানি এসে সব নিয়ে যায়, তাহলে কী দিয়ে চলব? সরকার যদি আগে থেকেই ভালোভাবে বাঁধগুলো ঠিক করত, তাহলে এত ভয় থাকত না’।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিন বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। পাশাপাশি উজানেও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে, যা নদ-নদীর পানি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আমিনুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, চলতি বছর হাওরাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে এবং ফলনও ভালো হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি সেই সম্ভাবনাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, জেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন ধান। এর মধ্যে হাওর অঞ্চলে ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৯২ হাজার ৫৯০ টন। সোমবার বিকেল পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।