
অধিক লাভের আশায় হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করে এখন লোকসান গুনতে হচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষক ও ব্যবসায়ীদের। হিমাগার ভাড়া, পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর দাম পড়েছে ১৯ থেকে ২০ টাকা। অথচ বাজারে সেই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১৪ টাকা কেজি দরে। এতে প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৬ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের।
হিমাগার মালিকরা বলছেন, হিমাগারে দীর্ঘদিন আলু সংরক্ষণ করায় পচন ধরেছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা দ্রুত আলু বের না করলে নষ্ট হয়ে যাবে। এতে তাদের পুরো লোকসানে পড়তে হবে।
সদর আকচা ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘আমি ৪ একর জমিতে আলু চাষ করেছিলাম। তখন বাজারে আলুর মূল্য ছিল ১১ টাকা করে। তাই বিক্রি করিনি। হিমাগারে রেখেছিলাম। ভেবেছিলাম পরে দাম বাড়লে খরচ উঠে লাভ হবে। কিন্তু এখন হিমাগার ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে আলুর দাম ১৯ থেকে ২০ টাকা পড়েছে। সেই আলু ১৪ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে বড় লোকসান হচ্ছে। তাই হিমাগার থেকে আলু বের করব কি না, সেই চিন্তায় আছি। তবে বেশিদিন রাখলে এমনিতেই আলু পচে নষ্ট হয়ে যাবে।’
নারগুন ইউনিয়নের কৃষক জয়নুল হক বলেন, ‘সারের দাম বেশি, সময়মতো সার পাওয়া যায়নি। তাও বেশি দাম দিয়ে সার কিনে ৩ একর জমিতে আলু চাষ করছিলাম। আলুর মৌসুম ছিল বলে ১০ থেকে ১২ টাকা মাঠে দাম বলছিল ব্যবসায়ীরা। কিন্তু বিক্রি করিনি। সব আলু হিমাগারে রেখেছি। গাড়ি ভাড়া আর হিমাগার ভাড়া সব মিলিয়ে কেজিতে ২০ টাকা পড়ছে। এখন আলুর বাজারমূল্য ১৫ টাকা। কেজিতে ৫ টাকা লস। আলু বের করে আর কী হবে। কৃষক এভাবে মারা যাবে। সব পণ্যের দাম বেশি, শুধু কৃষকের ফসল ছাড়া’
সদর রোডের ব্যবসায়ী আলম হক বলেন, ‘আমি এক হাজার বস্তা আলু শাহি হিমাগারে রেখেছি। আলুর মৌসুমে প্রতি কেজি ১২ টাকা করে আলু কিনতে হয়েছে। ভাড়া, হিমাগারে রাখাসহ প্রতি কেজিতে ২০ টাকা পড়ছে। এখন বর্তমান বাজারমূল্য ১৫ থেকে ১৬ টাকা। এ সময়ে হিমাগার থেকে প্রচুর আলু বের হওয়ার কথা। কিন্তু বাজারে চাহিদা নেই। এখনও প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আলু হিমাগারে পড়ে আছে। দ্রুত বাজারজাত করা না গেলে লোকসান আরও বাড়বে।’
শীবগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘গত ২-৩ মৌসুমে আলু চাষ করে ও হিমাগারে আলু রেখে আমরা অনেক লসের মুখে পড়েছি। এবারও একই অবস্থা। আমি হিমাগার থেকে আলু বের করছি না। তবে বেশি সময় আর আলু রাখা যাবে না। পচন ধরে সব নষ্ট হয়ে যাবে। এতে আমার পুঁজি হারিয়ে ফেলেছি। এভাবে চলতে থাকলে কৃষকরা আলু চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। সরকারের উচিত আলুর দাম সামঞ্জস্য রেখে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে উদ্যোগ নেওয়া।’
আলুর বাজারে মন্দার প্রভাব পড়েছে হিমাগারের শ্রমিকদের ওপরও। আলু ওঠানো ও নামানোর কাজ কমে যাওয়ায় কমেছে তাদের আয়। শাহি হিমাগারের শ্রমিক মিজান বলেন, ‘এখন হিমাগার থেকে আলু বের করার সময়। কিন্তু কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আলু বের করছেন না। এতে আমাদের কাজ নেই। আয়-রোজগার কমে গেছে। অভাবের মধ্যে আছি।’
আরেক শ্রমিক প্রফুল্ল রায় বলেন, ‘এই সময় ভোর থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন গাড়িতে আলুর বস্তা লোড করি। কিন্তু এখন কেউ তেমন আলু বের করছেন না। বাজারে দাম কম হওয়ায় এমনটা হচ্ছে। আবার আর অল্প কিছুদিন পর আলুতে পচন ধরবে। আমাদের রোজগার কমে গেছে।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমে ঠাকুরগাঁওয়ে ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৩৭ হাজার হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হয়েছে প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। জেলায় আলু সংরক্ষণের জন্য রয়েছে ১৯টি হিমাগার। এসব হিমাগারে বর্তমানে ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন আলু মজুদ রয়েছে। বাজারে চাহিদা কম থাকায় ধীরগতিতে আলু বের হচ্ছে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি হিমাগার মালিকরাও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
আমানত হিমাগারের ম্যানেজার রায়হান ইসলাম বলেন, ‘আলুর দাম না থাকায় হিমাগার মালিকরাও চিন্তিত। হিমাগার থেকে আলু বের না হলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিক সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। বাজারে আলুর দাম একদম কম। সরকারের পদক্ষেপ ছাড়া এই লোকসান কেউ আটকাতে পারবে না।’
শাহি হিমাগারের মালিক সিয়াম চৌধরী বলেন, ‘বাজারে আলুর দাম একদম কম, তাই কেউ আলু বের করতে চায় না। আর আমরা আলু বেশিদিন রাখতেও পারব না। বেশিদিন রাখলে আমাদের দ্বিগুণ লস। অনেক আলুতে পচন ধরছে। আমরা আলু নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষক ও ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। বর্তমানে আগের তুলনায় দাম অনেক কম থাকায় তারা লোকসানের মুখে পড়েছেন। লোকসান কমাতে দ্রুত আলু বাজারজাতের পাশাপাশি রফতানির উদ্যোগ নিতে হবে। এতে হিমাগারে পড়ে থাকা আলু দ্রুত বিক্রির সুযোগ তৈরি হবে এবং কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কিছুটা কম হবে।’
