বৈধ ভিসায় বাংলাদেশে এসে ‘মবের’ মুখে ভারতীয় নাগরিক

বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসায় ভারত থেকে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে স্থানীয় রাজনীতিকর্মীদের সৃষ্টি করা ‘মবসদৃশ’ পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা ভারতীয় নাগরিক আব্দুর রাজ্জাক।
ঘটনাটি ঘিরে এখন একাধিক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তার মোবাইলে সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারিদের নম্বর থাকার অভিযোগ উঠলেও কেন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি, সেটা নিয়ে যেমন আলোচনা তৈরি হয়েছে, তেমনি বৈধ কাগজপত্র থাকার পরও তাকে ঘিরে হেনস্তার পরিস্থিতি তৈরির ঘটনায় কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেটিও প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় নাগরিক আব্দুর রাজ্জাক বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার মোনাখালী ও বাগোয়ান গ্রামে তার নিকট আত্মীয়দের বাড়ি রয়েছে। তিনি মোনাখালী গ্রামে তার ফুপুর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
শুক্রবার (২২ মে) বিকেলে তিনি ঘুরতে যান মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে। সেখানে তার সঙ্গে আরও কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তি মুজিবনগর আম্রকাননে চেয়ার পেতে আড্ডা দিচ্ছিলেন।
এ সময় স্থানীয় যুবদল কর্মী ওমর ফারুক সেখানে গিয়ে কয়েকজন চিহ্নিত চোরাকারবারি এবং আওয়ামী লীগ-যুবলীগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেখতে পান বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, স্থানীয় আওয়ামী লীগ কর্মীরা কোনো ধরনের নাশকতা বা গোপন বৈঠকের পরিকল্পনা করছে, এমন সন্দেহ থেকেই তিনি মুজিবনগর থানায় ফোন দেন।
পরে ওমর ফারুক বিএনপি ও যুবদলের আরও কয়েকজন কর্মীকে ঘটনাস্থলে ডাকেন। এতে সেখানে ‘মবের’ মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এ সময় ভারতীয় নাগরিক আব্দুর রাজ্জাক নিজেকে বৈধভাবে বাংলাদেশে আসা ভারতীয় নাগরিক হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তখন তার সঙ্গে পাসপোর্ট ছিল না। তিনি জানান, পাসপোর্টটি মোনাখালী গ্রামে আত্মীয়ের বাড়িতে রাখা আছে।
এরই মধ্যে এসআই আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে মুজিবনগর থানা পুলিশের একটি টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ঘটনার বিবরণ শুনে এসআই আজাদ ভারতীয় নাগরিক আব্দুর রাজ্জাককে পাসপোর্ট দেখাতে বলেন এবং জানান, পাসপোর্ট দেখাতে না পারলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পর সীমান্ত দিয়ে পুশব্যাক করা হবে।
জানা গেছে, এ সময় ওমর ফারুকের নেতৃত্বে উপস্থিত বিএনপি ও যুবদল কর্মীরা আব্দুর রাজ্জাকের মোবাইল ফোন তল্লাশি করেন। পরে তারা পুলিশকে জানান, তার মোবাইলে মেহেরপুর জেলার কয়েকজন স্বর্ণ ব্যবসায়ী এবং সীমান্ত এলাকার চিহ্নিত কয়েকজন স্বর্ণ ও মাদক পাচারকারীর নম্বর সংরক্ষিত রয়েছে। এরপর পুলিশও তার মোবাইল ফোন পরীক্ষা করে।
একপর্যায়ে মোনাখালী গ্রামে থাকা আব্দুর রাজ্জাকের ফুফাতো ভাই ঘটনাস্থলে তার পাসপোর্ট নিয়ে আসেন। পুলিশ পাসপোর্ট পরীক্ষা করে দেখতে পায়, তিনি বৈধ ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছেন এবং পাসপোর্টে ইমিগ্রেশনের সিল রয়েছে। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ঘটনার পর দুটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রথমত, যদি তার মোবাইলে সীমান্ত এলাকার চোরাকারবারিদের নম্বর পাওয়া গিয়ে থাকে, তবে তাকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, তিনি যদি বৈধ কাগজপত্র নিয়ে বাংলাদেশে এসে থাকেন, তাহলে প্রকাশ্যে তাকে হেনস্তার মতো পরিস্থিতিতে ফেলাদের বিরুদ্ধে কেন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
যুবদল কর্মী ওমর ফারুক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে আমি আনন্দবাস গ্রামের চিহ্নিত চোরাকারবারি ও যুবলীগ কর্মী জাকারিয়া ওরফে জাকার, মুজিবনগরের সোনাপুর গ্রামের মাঝপাড়ার আওয়ামী লীগ কর্মী শরিফ এবং সুমনকে দেখতে পাই। তারা সবাই একাধিক চোরাচালান ও মাদক মামলার আসামি এবং এলাকার চিহ্নিত চোরাকারবারি।
ওই দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে এশিয়া পোস্ট। এ সময় হেনস্তার শিকার হওয়া মুজিবনগর উপজেলার সোনাপুর গ্রামের মাঝপাড়ার বাসিন্দা শরিফ বলেন, আমি আগে আওয়ামী লীগ করতাম। তাই আমাকে হেনস্তা করার জন্য মব তৈরি করা হয়েছে। আমাদের এলাকার ওমর ফারুক নামের বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে লাঞ্ছিত করেছেন।
তবে আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে পূর্ব পরিচয়ের বিষয়টি প্রথমে অস্বীকার করেন শরিফ। পরে তাকে জানানো হয়, পুলিশের মোবাইল তল্লাশিতে আব্দুর রাজ্জাকের ফোনে তার নম্বর পাওয়া গেছে। তখন শরিফ বলেন, আব্দুর রাজ্জাক আমার পূর্ব পরিচিত। সে মাঝেমধ্যে মোনাখালীতে আসে। তবে তিনি ও আব্দুর রাজ্জাক উভয়েই সীমান্তে চোরাকারবারে জড়িত এমন অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
মেহেরপুর শহর থেকে কারা এসেছিল জানতে চাইলে শরিফ বলেন, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক। যে কেউ যে কারও সঙ্গে দেখা করতেই পারে। এটা কি অপরাধ? মেহেরপুর থেকে আমার দুই বন্ধু এসেছিল, আরেকজন এসেছিল ফুলসুরাত নামে।
পরে তিনি আবারও দাবি করেন, ওমর ফারুক মব সৃষ্টি করে আমাকে ফাঁসাতে চেয়েছে। এর বেশিকিছু ঘটেনি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত বলে অভিযোগ ওঠা জাকারিয়া ওরফে জাকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে এক নারী ফোন রিসিভ করেন। তিনি প্রথমে নিজেকে জাকার পরিচয় দিয়ে প্রতিবেদককে বলেন, কী জানতে চান?
পরে প্রতিবেদক তাকে বলেন, জাকার তো একজন পুরুষ, কিন্তু আপনার কণ্ঠ স্পষ্ট নারীর। তখন ওই নারী বলেন, জাকার বাইরে আছে, যা বলার তাকেই বলতে হবে।
প্রতিবেদক তাকে মুজিবনগর কমপ্লেক্সের ঘটনার বিষয়ে বক্তব্য প্রয়োজন বলে জানিয়ে বলেন, জাকার বাড়িতে এলে যেন যোগাযোগ করে, তার বক্তব্য প্রয়োজন।
এরপর একাধিকবার কল করা হলেও জাকারের নম্বর থেকে আর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একইভাবে ঘটনাস্থলে থাকা অন্য অভিযুক্ত সোনাপুর মাঝপাড়া গ্রামের সুমনের মুঠোফোনেও একাধিকবার কল করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা মুজিবনগর থানা পুলিশের এসআই আবুল কালাম আজাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওখানে কয়েকজন গোল হয়ে মিটিং করছিল কি না, সেটা আমার জানা নেই। ওসি তদন্তের নির্দেশে আমি সেখানে যাই। গিয়ে দেখি কয়েকজন একজন ভারতীয় নাগরিককে ধরে রেখেছে। আমি তার পরিচয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, বৈধ পাসপোর্টে বাংলাদেশে এসেছেন। তবে তখন তার সঙ্গে পাসপোর্ট ছিল না।
তিনি আরও বলেন, ভারতীয় নাগরিক আমাকে জানান, মোনাখালী গ্রামে তার ফুফুর বাসায় পাসপোর্ট আছে। আমি তাকে পাসপোর্ট আনার ব্যবস্থা করতে বলি। যদি প্রমাণিত হতো তিনি পাসপোর্ট ছাড়া এসেছেন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতাম। পরে তার ফুফাতো ভাই পাসপোর্ট নিয়ে আসে। আমি পাসপোর্ট পরীক্ষা করে দেখি, তিনি বৈধভাবে ইমিগ্রেশন পার হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন।
এসআই আজাদ বলেন, আমার ধারণা, স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তার কাছ থেকে কোনো অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। কারণ আমি যখন পাসপোর্ট দেখে তাকে ছেড়ে দিই, তখন সেখানে উপস্থিত কয়েকজন আমাকে বলে, আপনি লোকটাকে এমনি এমনি ছেড়ে দিলেন। এ কথা শুনে আমি খুবই বিস্মিত হয়েছি।
এ বিষয়ে মেহেরপুর জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পার্সন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি খবর নিয়ে জেনেছি, স্থানীয় কিছু ব্যক্তি একজন ভারতীয় নাগরিককে আটকে রেখেছিল। মুজিবনগর থানা পুলিশের টিম সেখানে গিয়ে তার পাসপোর্ট পরীক্ষা করে দেখতে পায়, আব্দুর রাজ্জাক নামের ওই ব্যক্তি বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে ট্যুরিস্ট হিসেবে বাংলাদেশে এসেছেন। এরপর তাকে ঘটনাস্থলেই জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
