রামপালে অতি ঝুঁকিপূর্ণ ১৯ বিদ্যালয়ে আতঙ্ক নিয়ে চলছে পাঠদান

বৃষ্টি হলেই পানি ঢুকে শ্রেণিকক্ষে। কোথাও আবার ছাদের পলেস্তারা পড়ছে খসে। দেয়াল ও পিলারেও দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। বেরিয়ে এসেছে মরিচাধরা রড। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার এমন ১৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে প্রায় ১ হাজার ৭৭০ শিশু। দীর্ঘদিন সংস্কার বা পুনর্নির্মাণ না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এতে উদ্বেগে রয়েছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, রামপাল উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১২৭টি। এর মধ্যে ১৯টি বিদ্যালয়কে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চাহিদা পাঠানো হয়েছে।
সরেজমিনে মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবনের চারপাশে পানি জমে আছে। ভবনের বিভিন্ন স্থানে দরজা-জানালা নেই। দেয়াল ও পিলারে বড় বড় ফাটল। ছাদ থেকে খসে পড়ছে পলেস্তারা ও বালু। বৃষ্টির সময় ছাদ চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। এতে বই-খাতা রক্ষায় শিক্ষার্থীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।
শুধু মুজিবনগর চর বিদ্যালয় নয়, উপজেলার আরও কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ পুরোনো ভবনের পাশেই চলছে নিয়মিত পাঠদান। আবার কোথাও স্থায়ী ভবন না থাকায় টিন কিংবা গোলপাতার অস্থায়ী ঘরে ক্লাস নিতে হচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে টিনের ঘর অসহনীয় হয়ে ওঠে, আর বৃষ্টির সময় শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে ব্যাহত হয় পাঠদান।
ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর মধ্যে রয়েছে—দ্বিজবর মল্লিক মেমোরিয়াল হাতীরবেড় সুলতানিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সগুনা দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তালবুনিয়া উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পূর্ব বাঁশতলী উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বি.এস. কুইন্টন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বর্নি ছায়রাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সন্নাসী তালুকদারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাঁশতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রনসেন আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেতকাটা-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফুলপুকুরিয়া পেড়িখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধলদাহ হাজী সাহেব আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌরম্ভা দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভৈরবডাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গৌরম্ভ পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইসলামাবাদ দক্ষিণপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বড় নবাবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা জানান, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকি নয়, শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। বৃষ্টির সময় শ্রেণিকক্ষে পানি ঢুকে পড়ে। অনেক বিদ্যালয়ের মাঠে পানি জমে থাকায় শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার সুযোগও কমে গেছে। জরাজীর্ণ ভবন দেখে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মুজিবনগর চর (বাঁশতলী) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাওলাদার জাকির বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই জোড়াতালি দিয়ে পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। শিশুদের পড়ানোর পাশাপাশি তাদের নিরাপত্তা নিয়েও সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। ভবনটি দ্রুত অপসারণ করে নতুন ভবন নির্মাণ করা জরুরি।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাহুল দাস বলে, আমাদের স্কুলের ভবন অনেক নষ্ট হয়ে গেছে। ছাদ থেকে প্রায়ই বালু ও সিমেন্টের গুঁড়া খসে পড়ে। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে, মাঠেও পানি জমে থাকে। আমরা ভয় নিয়ে ক্লাস করি। নতুন ভবন হলে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে পারব।
শামিমা খাতুন নামে আরেক শিক্ষার্থী বলে, গরমের সময় টিনের ঘরের ভেতরে অনেক গরম লাগে। তখন ক্লাসে বসে থাকা কষ্টকর হয়ে যায়। বৃষ্টি হলেও সমস্যা হয়। নতুন ভবন হলে আমরা নিরাপদে ও আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারব।
শিক্ষার্থী আদনান রহমান ও তানিহা খাতুন জানায়, স্কুলের ভবন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ছাদ থেকে বালু ও সিমেন্টের গুঁড়া পড়ে। মাঠে পানি জমে থাকে। গরমের সময় টিনের ঘরেও বসা কষ্টকর হয়ে যায়। নতুন ভবন হলে স্বাচ্ছন্দ্যে পড়াশোনা করতে পারবে তারা।
মুজিবনগর চর এলাকার অভিভাবক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ছেলেমেয়েদের ভালোভাবে পড়াশোনা করাতে চাই। কিন্তু স্কুলের ভবনের যে অবস্থা, তাতে সন্তানকে পাঠিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। ছাদ ও দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ে। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি ঢোকে। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিভাবক রেহানা বেগম বলেন, আমার সন্তান প্রতিদিন এই স্কুলে যায়। পুরোনো ভবন দেখে ভয় লাগে, বিশেষ করে বৃষ্টি বা ঝড়ের সময়। বাড়িতে ফিরে অনেক সময় স্কুলের সমস্যার কথা বলে। আমরা চাই, সরকার দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটি সরিয়ে নতুন ভবন নির্মাণ করুক। তাহলে সন্তানদের নিরাপদে স্কুলে পাঠাতে পারব।
কয়েকজন শিক্ষক ও অভিভাবক জানান, বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে। ভবনের ছাদ বা দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়লে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। এমন পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে পাঠদান করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রামপাল উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল কুদ্দুস তালুকদার বলেন, তিনি সম্প্রতি এ উপজেলায় যোগ দিয়েছেন। যোগদানের পর কয়েকটি বিদ্যালয় পরিদর্শন করে ১৯টি বিদ্যালয়কে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। কিছু বিদ্যালয়ে ভবন সংকটের কারণে স্থানীয়দের সহযোগিতায় গোলপাতার ঘরেও পাঠদান চলছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।