মৃত্যুর এক দিন আগে মায়ের জন্য টাকা পাঠিয়েছিলেন দুই ভাই

সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দক্ষিণ সুরমার তেতলি এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত আটজন শ্রমিকের মধ্যে রয়েছেন দুই ভাই। অসুস্থ মায়ের জন্য এক দিন আগে শনিবার (২ মে) মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তারা টাকা পাঠিয়েছিলেন। রোববার সকালে কাজে যাওয়ার পথে পিকআপভ্যানের সঙ্গে ট্রাকের সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণ হারান তারা।
দুই ভাই হলেন আজির উদ্দিন, আমির উদ্দিন। তারা সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলায় পলাশ ইউনিয়নের মুক্তিখলা গ্রামের আব্দুল গফফারের ছেলে। দুজন সিলেট নগরের সবুজবাগ এলাকার একটি কলোনিতে থাকতেন। তারা রাজমিস্ত্রীর কাজ করতেন।
তাদের চাচাতো ভাই জুবায়ের জামিল জানান, আজির ও আমিরের মা অসুস্থ। সম্প্রতি কোমরের হাড় ভেঙে গেছে। দুই ভাই শনিবার মায়ের জন্য বিকাশে টাকা পাঠিয়েছিলেন। রাতে দুই ভাইয়ের সঙ্গে তাদের মায়ের কথা হয়। সকালে তিনি প্রতিবেশীর মাধ্যমে জানতে পারেন দুই ছেলে কাজে যাওয়ার পথে মারা গেছেন।
তিনি আরও জানান, আজির ও আমিরের ছোট ভাই কয়েক বছর আগে কুকুরের কামড়ে মারা গেছেন। তাদের একমাত্র বোনটিও শারীরিক প্রতিবন্ধী। তার স্বামী মারা গেছেন। একটি শিশুসন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন।
আজির ও আমিরের সঙ্গে সিলেট শহরে শ্রমিকের কাজ করতেন মো. সিয়াম। তিনি বলেন, আমরা একসঙ্গে কাজে যেতাম। আমি ছুটিতে এসেছি, তারা ঈদের পর আর বাড়ি আসেনি। গতকালই তাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। আজ কাজে যাবে বলেছিল।
রোববার সকাল ৬টা ২৫ মিনিটের দিকে শ্রমিকবাহী একটি পিকআপ ও বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ট্রাকের সংঘর্ষে ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে চারজন এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। সিলেটে লালাবাজার এলাকায় একটি ভবন ঢালাইয়ের কাজে তারা যাচ্ছিলেন।
নিহত অন্য ছয়জন হলেন, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া গ্রামের মৃত খরম আলীর ছেলে মো. সুরুজ আলী, একই উপজেলার শেষস্তি গ্রামের আব্দুল বাসিরের মেয়ে মোছা. মুন্নি, দিরাই উপজেলার নুরনগর এলাকার মৃত নূর সালামের ছেলে মো. ফরিদুল, ধর্মপাশা উপজেলার সাবিরা গ্রামের ইদ্রিসের স্ত্রী নার্গিস, সিলেটের জালালাবাদ থানার লালারগাঁও এলাকার সুজাত আলীর ছেলে মো. বদরুল আমীন এবং কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার শিবপুর গ্রামের কুঠির বিশ্বাসের ছেলে পান্ডব বিশ্বাস।
আহতদের মধ্যে কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। তারা হলেন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার আমকান্দি গ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে মো. আলমগীর, সিলেট নগরের কালিবাড়ি এলাকার মৃত শুকুর উল্লাহর ছেলে তোরাব উল্লাহ, আম্বরখানার লোহারপাড়ার মৃত আলিম উদ্দিনের ছেলে রামিন ও একই এলাকার মল্লিক মিয়ার ছেলে আফরোজ মিয়া, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার গাছতলা গ্রামের খোকন মিয়ার মেয়ে রাভু আক্তার, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পাউমারা গ্রামের বদরুজ্জামানের মেয়ে হাফিজা বেগম এবং দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়ার জফুর আলীর ছেলে রাজা মিয়া।
দুর্ঘটনায় আহত হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের আলমগীর এশিয়া পোস্টকে জানান, তারা লালাবাজারে একটি ভবনের ঢালাইয়ের কাজে যাচ্ছিলেন। একই পিকআপভ্যানে ২০-২২ জন শ্রমিক ছিলেন। তেতলি এলাকায় সুনামগঞ্জ বাইপাসের আগে বিপরীত থেকে আসা কাঠালবোঝাই একটি ট্রাক সরাসরি পিকআপভ্যানে ধাক্কা দেয়। এরপর তারা অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। জ্ঞান ফেরার পর দেখতে পান কেউ হাত-পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতপ্রাপ্ত, কেউ ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রিয়াজুল কবির জানান, হতাহতদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। কয়েকজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, দুর্ঘটনার পর পিকআপ ও ট্রাকচালক পলাতক রয়েছে। তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. উমর রাশেদ মুনির এশিয়া পোস্টকে জানান, মরদেহগুলো মর্গে রাখা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে ময়নাতদন্ত করা হবে। আহতদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আইসিইউতে নেওয়া হয়েছে।