পদ্মা সেতুতে বদলেছে যাতায়াত, বদলায়নি বাগেরহাট বাস টার্মিনাল

পদ্মা সেতু চালুর পর বাগেরহাট থেকে দূরপাল্লার বাস চলাচল ও যাত্রীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি জেলার একমাত্র কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের সেবার মান ও অবকাঠামো। দীর্ঘদিন সংস্কার ও আধুনিকায়ন না হওয়ায় টার্মিনালটির বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্তে পানি জমে কাদার সৃষ্টি হয়। পর্যাপ্ত জায়গার অভাবে অধিকাংশ দূরপাল্লার বাস টার্মিনালের বাইরে সড়কের পাশে পার্কিং করে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছে। এতে ভোগান্তির পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার যাত্রী এই টার্মিনাল ব্যবহার করেন। এখান থেকে প্রতিদিন আটটি রুটে চলাচল করে তিন শতাধিক বাস ও মিনিবাস। কিন্তু যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বাড়লেও সেই তুলনায় বাড়েনি টার্মিনালের সুযোগ-সুবিধা।
সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের ভেতরের বিভিন্ন অংশে বড় বড় গর্ত, কাদা ও পানি জমে আছে। জায়গা না থাকায় অধিকাংশ দূরপাল্লার বাস প্রধান সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী তুলছে ও নামাচ্ছে। এমনকি কয়েকটি পরিবহনের কাউন্টারও গড়ে উঠেছে টার্মিনালের বাইরে। ফলে ব্যস্ত সড়কের ওপর দাঁড়িয়েই যাত্রীদের বাসে উঠতে ও নামতে হচ্ছে। এতে তীব্র যানজটের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে দুর্ঘটনার মারাত্মক ঝুঁকি।
চট্টগ্রাম থেকে আসা যাত্রী রায়হান শেখ বলেন, বাসে উঠতে বা নামতে গিয়ে অনেক সময় মূল সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে বড় বাস চলে যাওয়ার সময় আতঙ্ক লাগে। টার্মিনালের ভেতরে যদি পর্যাপ্ত জায়গা থাকত, তবে আমাদের এই ভোগান্তি হতো না।
আরেক যাত্রী শাওন বলেন, বৃষ্টির সময় টার্মিনালের অবস্থা আরও বেহাল হয়ে পড়ে। কোথাও পানি, আবার কোথাও কাদা। নারী, শিশু ও বয়স্কদের চলাচল করা খুবই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা দেখলেও এর কোনো স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
ঢাকা থেকে আসা যাত্রী শাফিন আহমেদ বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর বাস ও যাত্রী দুটোই বেড়েছে। কিন্তু টার্মিনাল রয়ে গেছে আগের মতোই। রাস্তায় বাস দাঁড় করিয়ে যাত্রী তুললে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। দ্রুত এই টার্মিনাল আধুনিকায়ন করা দরকার।
যশোর থেকে আসা নাফিজা বলেন, বাস টার্মিনালের ভেতরে পর্যাপ্ত বসার ও অপেক্ষা করার জায়গা নেই। বৃষ্টির সময় কাদা-পানি মাড়িয়ে বাসে উঠতে হয়। শিশু বা বয়স্ক স্বজন সাথে থাকলে ভোগান্তি আরও বাড়ে। নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা থেকে যায়। কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত টার্মিনালটি সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৪ সালে পৌরসভা এলাকার মহাসড়কের পাশে দুই একর জমির ওপর বাগেরহাট স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) বাস টার্মিনালটি নির্মাণ করে। দুই দশকের বেশি সময় পার হলেও টার্মিনালটির উল্লেখযোগ্য কোনো অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। বর্তমানে ৮টি রুটে প্রতিদিন তিন শতাধিক যান চলাচলের কারণে পুরোনো এই টার্মিনালটি অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
বাগেরহাট জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বলেন, টার্মিনালের অবস্থা একেবারেই নাজুক। বড় গর্ত আর কাদার কারণে যাত্রীদের যেমন কষ্ট হচ্ছে, তেমনি গর্তে পড়ে প্রতিনিয়ত বাস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্প্রিংয়ের পাতি ভেঙে যাওয়া সহ নানা যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় পরিবহন মালিকদের লোকসান গুণতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিবহন মালিকরা নিয়মিত টার্মিনালের কর পরিশোধ করে আসছেন। এরপরও কেন মেরামত হচ্ছে না, তা বোধগম্য নয়। পৌরসভার পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হলেও বাস্তবে কোনো উদ্যোগ দেখছি না।
তিনি অনতিবিলম্বে টার্মিনালটি সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে যাত্রী, চালক ও শ্রমিকদের ভোগান্তি দূর করার জোর দাবি জানান।
বাগেরহাট পৌরসভার প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন বলেন, বাগেরহাট পৌর বাসস্ট্যান্ডটি পুরোনো হওয়ায় এটি আধুনিকায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে এটিকে একটি আধুনিক ও উন্নত বাসস্ট্যান্ডে রূপান্তর করা হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে বাসস্ট্যান্ডে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছিল, যেখানে ইতোমধ্যে ইট-বালু দেওয়া হয়েছে। এরপরও কোনো সমস্যা থাকলে তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমস্যাগুলো গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। লাইটিংয়ের সমস্যাটিও দ্রুত সমাধান করা হবে।
পৌরসভার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানান, বাস টার্মিনাল সম্প্রসারণের জন্য আরও প্রায় তিন একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে। জমি অধিগ্রহণ শেষ হলে পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি যাত্রীসেবার মানও বৃদ্ধি করা হবে।


