কাপ্তাই হ্রদে নাব্যসংকট, দুর্ভোগে কয়েক লাখ মানুষ

একসময় হুয়াং হো নদীকে বলা হতো ‘চীনের দুঃখ’। আর বর্তমান সময়ে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার মানুষের প্রধান দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘কাপ্তাই হ্রদ’। বছরের প্রায় সাত থেকে আট মাস হ্রদের পানি শুকিয়ে যাওয়ার ফলে জেলার পাঁচটি উপজেলার নৌযোগাযোগ ব্যবস্থা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে কয়েক লাখ স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের। শিগগিরই ভারী বর্ষণ না হলে উপজেলার সঙ্গে নৌ যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যাওয়া আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৬০ সালে একমাত্র কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য তৈরি হয়েছিল বহুমুখী এই কাপ্তাই হ্রদ। তবে দীর্ঘ ৬৬ বছরেও এই হ্রদে একবারের জন্যও কোনো খনন বা সংস্কার কার্যক্রম চালানো হয়নি। ফলে বছরের পর বছর ধরে অবৈধ দখল, দূষণ, মানবসৃষ্ট বর্জ্য এবং পাহাড়ি ঢলের পলি জমে তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। চলতি মৌসুমের শুরুতে প্রয়োজনীয় বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং তীব্র দাবদাহের কারণে হ্রদের পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় রাঙামাটি সদর থেকে বিলাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলার নৌ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। শুষ্ক মৌসুমে বিস্তীর্ণ চর জেগে ওঠায় লঞ্চ ও ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল করতে পারছে না।

বর্তমানে হ্রদ শুকিয়ে যাওয়ায় জুরাছড়ি উপজেলায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার, বিলাইছড়িতে ২০ কিলোমিটার, বরকলে ১৫ কিলোমিটার এবং লংগদু উপজেলার প্রায় ৭০ কিলোমিটার জলপথ নাব্য হারিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সংশ্লিষ্ট উপজেলাগুলোর সরকারি দপ্তরগুলোতেও। নৌপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী সময়মতো কর্মস্থলে যাতায়াত করতে পারছেন না।
এদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জেলায় উৎপাদিত কোটি কোটি টাকার কৃষিপণ্য ও কাঁচামাল সময়মতো বাজারজাত করতে না পেরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন পাহাড়ের জুমচাষিরা। বিশেষ করে এই অঞ্চলে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ আদা, হলুদ, কলা, আম, কাঁঠাল, আনারসসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও শাকসবজি ঘাটে আটকে থেকে পচে যাচ্ছে।
লংগদু নিয়মিত যাতায়াতকারী যাত্রী মো. নাছির উদ্দিন জানান, হ্রদে পানি থাকলে যেখানে সময় লাগত তিনি থেকে চার ঘণ্টা, এখন সেখানে লাগছে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা। লঞ্চ মূল ঘাটে পৌঁছাতে না পেরে অনেক দূরে ‘সাধুর টিলা’ নামক স্থানে যাত্রী নামিয়ে দেয়, সেখান থেকে আবার ছোট বোটে করে বাড়তি খরচে যাতায়াত করতে হয়।

বরকল উপজেলায় হরিনা বাজারে ব্যবসা করেন মো. সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী বাজার হরিনা। আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষে এখানে আসেন। লঞ্চ আগে হরিনা বাজারে গেলেও এখন পানি কমে আসায় আর যায় না। ফলে ছোট বোটে করে পণ্যপরিবহন করতে খরচ বেড়ে গেছে।
বিলাইছড়ির বাসিন্দা পুষ্প চাকমাও একই ধরনের ভোগান্তি ও বাড়তি খরচের কথা জানান।
রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দিন সেলিম জানান, আগে রাঙামাটি থেকে উপজেলাগুলোতে ৪২টি যাত্রীবাহী লঞ্চ চলাচল করলেও পানি শুকিয়ে যাওয়ায় এখন মাত্র আট থেকে ১০টি লঞ্চ কোনোমতে চলছে। লঞ্চ ও ইঞ্জিনবোট বন্ধ থাকায় মালিকদের দৈনিক লোকসান হচ্ছে ১৫ লাখ টাকারও বেশি। আয় কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন পাঁচ হাজার নৌযান শ্রমিক।
তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি হ্রদের পানি শুকিয়ে যায়, যা জুন বা জুলাইতে বৃষ্টি হলে হ্রদের পানি বাড়তে থাকে। তবে এবছর জুন মাসে বৃষ্টি না হওয়ায় কষ্ট এখনও কমেনি।

রাঙামাটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী তনয় কান্তি ত্রিপুরা বলেন, কাপ্তাই হ্রদ খননের দাবি দীর্ঘদিনের। তবে এর মধ্যেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৬৮৭ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। আশা করছি আগামী অর্থ
বছর থেকে কাজ শুরু হলে দুর্ভোগ কমে আসবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হলে রাঙামাটিবাসী এর সুবিধা ভোগ করবেন।
রাঙামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফী বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ড কাপ্তাই হ্রদ খননের জন্য প্রকল্প নিয়েছে। বর্ষা মৌসুমের পরেই হয়তো কাজ শুরু হবে আশা করছি। তখন এই এ সমস্যা আর থাকবে না।





