বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থি নেতা, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষবিদায়

চুয়াডাঙ্গায় নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুজ্জামান নান্টু ওরফে লাল্টুর (৭৭) রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টায় স্থানীয় নান্টু ফুটবল মাঠে তাকে গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালাম জানানো হয়। পরে আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে নিজ বাড়িতে তিনি মারা যান। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। সন্ধ্যায় টয়লেটে যাওয়ার সময় স্ট্রোক করে পড়ে গিয়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
মুক্তিযোদ্ধা থেকে চরমপন্থি রাজনীতি
নুরুজ্জামান নান্টু মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতার পর তিনি চরমপন্থি রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭২ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান। ১৯৭৩ সালের ১৪ জুলাই চুয়াডাঙ্গা উপকারাগার ভেঙে বড় ভাই মতিয়ার রহমান মন্টুসহ ১৫২ জন বন্দির সঙ্গে পালিয়ে যান।
পরে তিনি পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি ও পূর্ববাংলার (এমএল-লাল পতাকা) সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আঞ্চলিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় এলাকায় একাধিক সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের অভিযোগে তিনি সমালোচিত হন।
১৯৯৯ সালের ২৯ জুলাই খুলনার তৎকালীন ডিআইজি লুৎফুল কবিরের কাছে অস্ত্র জমা দিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। তখন তার বিরুদ্ধে ২১টি হত্যাসহ অন্তত ২৬টি মামলা ছিল। পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) নেতা কাজী আরেফ আহমেদসহ পাঁচ নেতা হত্যা মামলায়ও তার নাম আসে।
তিনটি মামলায় মোট ৭০ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হলেও ১৯ বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। এরপর নিজ গ্রামেই বসবাস করছিলেন।
কারামুক্তির সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমি বিপথগামী ছিলাম, এখন ফুলের মতো জীবনযাপন করতে চাই। কেউ যেন আমার মতো বিপথগামী না হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর একসময় তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থি সংগঠন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। পরে তিনি নিজস্ব একটি বাহিনী গড়ে তোলেন।
চুয়াডাঙ্গার সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) বেলাল হোসেন বলেন, নব্বইয়ের দশকে নুরুজ্জামান লাল্টু চরমপন্থি সংগঠন বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন।
শেষ জীবন ও স্থানীয় ভূমিকা
জীবনের শেষ পর্যায়ে এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে যুক্ত হন নান্টু। ভালাইপুর মোড়ে পানহাট ও কাঁচা সবজির হাট এবং গোকুলখালীতে পশু ও মাছের আড়ৎ স্থাপনে তার ভূমিকার কথা স্থানীয় বাসিন্দারা উল্লেখ করেন। তাদের ভাষ্য, এসব উদ্যোগে এলাকায় ব্যবসার পরিবেশ তৈরি হয়।
তার জানাজায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সহযোদ্ধা ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন। সহযোদ্ধাদের কেউ কেউ বলেন, মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল সাহসিকতাপূর্ণ। তবে স্বাধীনতার পর তার রাজনৈতিক জীবন ছিল বিতর্কিত।