logo
Advertisement

চতুর্দেশীয় স্থলবন্দরটি দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক হাব হয়ে উঠতে সক্ষম

আবু সালেহ মো. রায়হান
চতুর্দেশীয় স্থলবন্দরটি দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক হাব হয়ে উঠতে সক্ষম
বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের এক নম্বর ফটক। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়। সম্প্রতি তোলা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

স্থলপথে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ায় রাজস্ব আদায়ে বড় ভূমিকা রাখছে দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্দর দিয়ে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি হয়েছে। করোনা মহামারির পর এই বাণিজ্যিক রুট থেকে সরকারি কোষাগারে রেকর্ড রাজস্ব জমা হয়েছে। সবশেষ অর্থবছরে (২০২৫-২৬) লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ রাজস্ব আদায় হয়েছে। ওই অর্থবছরে এই স্থলবন্দরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩০ কোটি কোটি ২৫ লাখ টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪২৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা।

Advertisement

এর আগে যথাক্রমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১১৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ১৬৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৯২ কোটি ৬৩ লাখের বিপরীতে আদায় হয়েছে ১১০ কোটি ৫১ লাখ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৮ কোটি ৩৩ লাখ টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছে প্রায় ৬৪ কোটি সাত লাখ টাকা।

তবে ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি ছিল। এই অর্থবছরে ৭০ কোটি ৫৭ লাখ টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৪১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বিপরীতে আদায় হয়েছে ৬৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের একমাত্র চতুর্দেশীয় স্থলবন্দর বাংলাবান্ধা। এই বন্দরটি ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশকে সংযুক্ত করেছে। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে গত চার অর্থবছরে টানা রাজস্ব আদায় বেড়েছে। পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা রেলপথ নির্মাণ এগিয়ে নেওয়া গেলে সম্ভাবনার দুয়ার আরও বিস্তৃত হবে।

যদিও রেলপথ নির্মাণ নিয়ে ধোঁয়াশা কাটেনি। তবে চার দেশকে রেলপথে যুক্ত করলে বাংলাবান্ধা হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র। অর্থাৎ স্থলপথে সরাসরি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে। সুনজর পেলে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যিক হাব হয়ে উঠতে সক্ষম।

ধারাবাহিক কার্যক্রম

১৯৯৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। ২০১১ সালে ভারত ও ২০১৭ সালে ভুটানে সঙ্গে শুরু হয় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। ১০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এই স্থলবন্দর অর্থনীতিতে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

ব্যবসায়ীরা জানান, বন্দরটি নানা জটিলতায় করোনা-পরবর্তী সময়ে ঝিমিয়ে পড়লেও আবারও ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। বন্দরটি হাঁটাহাঁটি পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছে। গত চার অর্থবছরে বন্দরটি রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব আদায় করেছে। এ বন্দর দিয়ে নেপালে সব থেকে বেশি পরিমাণে পণ্য রপ্তানিতে রাজস্ব আদায় বেশি হচ্ছে। তবে ভুটান ও ভারতে পণ্য রপ্তানি তুলনামূলক কম।

বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, চারদেশীয় হলেও ভবিষ্যতে চীনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে আমাদের বন্দরটি আরও গতিশীল হবে। তবে এখানে আমদানি-রপ্তানিতে যদি গতি আনা যায়, বন্দরের ইয়ার্ড বাড়ানো যায় তাহলে ব্যবসায়ীদের সুবিধা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি করা পণ্যের মধ্যে ৯৫ শতাংশ পাথর। ভারত ও ভুটান থেকে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পাথর আমদানি করা হয়। ভারত থেকে গম, গমের ভুসি, ভুট্টা, চাল, পাথর, চা প্রক্রিয়াকরণ যন্ত্রাংশ, আদা আমদানি করা হয় এবং ঝুট কাপড়, সয়াবিন মিল রপ্তানি হয়। তবে আগে ভারত থেকে সব ধরনের ফলমূল আমদানি করা হলেও নানা জটিলতায় বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে।

এই বন্দর দিয়ে জুট, সিসা, আলু, ফলের রস, ওয়েস্ট কটন, কাপড়, কাঠ ও প্লাস্টিকের আসবাবপত্র, সুতলি, কটন র‍্যাগস, কাঁচ, ব্যাটারি, ওষুধ ও প্রসাধনসামগ্রী নেপালে রপ্তানি করা হয়। এ ছাড়াও দেশটিতে প্রাণ এবং ওয়ালটন ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজসহ ইলেকট্রনিকস এবং খাদ্যপণ্য, জুস ও টিস্যু পেপার নেপালে রপ্তানি করা হয়। আমদানি করা হয় চিটাগুড়, মসুর ডাল, ছোলাবুট, সরিষার তেল, ডাবর পণ্য, চ্যবনপ্রাশ পণ্য, হাজমওলা ট্যাবলেট ও ফুলঝাড়ু।

সুবিধাজনক বাণিজ্যিক স্থান

বাংলাদেশের ও ভারতের মধ্যে যতগুলো স্থলবন্দর চালু রয়েছে এর মধ্যে বাংলাবান্ধা সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থানে অবস্থানে রয়েছে। এখান থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির দূরত্ব ১৬ কিলোমিটার। ভারতের যে কোনো স্থানে যাতায়াতের সুবিধা রয়েছে। ভারতের শৈল্য শহর দার্জিলিং ৭৭ কিলোমিটার, নেপাল সীমান্ত ৫৪ কিলোমিটার, ভুটান সীমান্ত ১৩০ কিলোমিটার ও চীন সীমান্ত ২০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের পার্শ্ববর্তী ভারতের শিলিগুড়ির মতো সমৃদ্ধ এত বড় শহর অন্যান্য স্থলবন্দরের কাছে নেই। ভারতের ‘সেভেন সিস্টারস’ রাজ্যগুলোতে যাওয়ার সবচেয়ে সুবিধাজনক করিডোর হচ্ছে দার্জিলিং জেলার বাগডোগরা বিমানবন্দর; যা বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরের বিপরীতে ভারতের ফুলবাড়ি স্থলবন্দর অবস্থান।

ইমিগ্রেশন কার্যক্রম শুরু হওয়ার ফলে ভারতের ফুলবাড়ি স্থলবন্দরের দিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার পাওয়াসহ পঞ্চগড় জেলা উন্নয়নের পাশাপাশি বদলে যাবে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের চিত্র।

২০২৩ সালে উদ্বোধনের পর থেকে ভারতের শিলিগুড়ি মার্কেটিং টার্মিনাল (আসামের নুমালীগড় রিফাইনারি) থেকে বাংলাদেশের পার্বতীপুর রেলহেড তেল ডিপোতে জ্বালানি আনা হয়। এই মৈত্রী পাইপলাইন একটি আন্তঃসীমান্ত জ্বালানি প্রকল্প। পাইপলাইনটির মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী মূল্যে ডিজেল সরবরাহ করা হয়। ১৫ বছর মেয়াদি একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির আওতায় ভারত থেকে এই তেল আনা হচ্ছে। পার্বতীপুর ডিপোতে তেল পৌঁছানোর পর তা পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা ওয়েল কোম্পানির মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।

পাইপলাইনটির মোট ১৩১ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ। এর মধ্যে পাঁচ কিলোমিটার ভারতে এবং বাকি ১২৬ দশমিক পাঁচ কিলোমিটার বাংলাদেশে পড়েছে। এটি ভারতের শিলিগুড়ি থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশের পঞ্চগড় ও নীলফামারী হয়ে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে পৌঁছেছে। ভারতের আসাম থেকে তেল পাম্প করার পর পার্বতীপুরে পৌঁছাতে মাত্র ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা সময় লাগে। এর মাধ্যমে প্রতি বছর ১০ লাখ টন পর্যন্ত জ্বালানি তেল আমদানি করা সম্ভব।

সব দিক নিয়ে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর লিমিটেডের ইনচার্জ ও ম্যানেজার আবুল কালাম আজাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, দেশের এই বন্দরটি তার গৌরবময় সময় পার করছে। ধারাবাহিক রাজস্ব আদায় বাড়ছে। বন্দরের নিরাপত্তা, ইয়ার্ড বাড়ানোসহ বন্দরের সার্বিক উন্নয়নে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ চলছে।

বিষয় :