logo

ধান চাষ আগের মতো লাভজনক নেই

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ, সম্রাট আলাউদ্দিন, ধামরাই (ঢাকা)
ধান চাষ আগের মতো লাভজনক নেই
ধান কাটার পর ক্ষেতের পাশে চলছে মাড়াই। সম্প্রতি সাভারের মাদারপুর গ্রামে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঢাকার অদূরে ধামরাইয়ের মাদারপুর গ্রামের কৃষক আব্দুস সালাম। প্রায় ২০ বছর ধরে ধান চাষ করছেন। এবারও প্রায় এক একর (৯০ শতাংশ) জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছেন। সব মিলিয়ে খরচ করেছেন ৫৫ হাজার টাকা। ধান পেয়েছেন ৬০ মণ; বর্তমান বাজারমূল্যে (এক হাজার ২০০ টাকা) যা ৭০ হাজার টাকার।

ফসল ঘরে ওঠার আনন্দের চেয়ে খরচের হিসাবই বেশি ভাবাচ্ছে আব্দুস সালামকে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ৭০ হাজার টাকার ধানের সঙ্গে কিছু টাকার খড় বিক্রি করতে পারব। এখন ধান চাষে লাভ বলতে তেমন কিছু নেই। বছরের ঘরের খাবারের চালের নিশ্চয়তার জন্য চাষ করে যাওয়া ছাড়া কিছুই না।

খরচের হিসাব দিয়ে এই কৃষক জানান, ধান কাটতে খরচ হয়েছে ২২ হাজার টাকা। মাড়াইয়ে দুই হাজার ৭০০ টাকা। সেচ ও জমি প্রস্তুতে ১০ হাজার টাকা। সার কিনতে ১২ হাজার টাকা। চারা রোপণের সময় শ্রমিকের পেছনে আরও ৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। নিজের শ্রমের মূল্য ধরেননি তিনি।

লাভ কমে যাওয়ার কারণ

ধামরাইয়ের বিভিন্ন এলাকায় গত সপ্তাহ থেকে ধান কাটা শুরু হয়েছে। তবে কয়েক দফা বৃষ্টি ও ঝোড়ো বাতাসে অনেক জায়গায় ধান কাটায় বিঘ্ন ঘটে। কোথাও জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার নামানো যায়নি। ফলে শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের মজুরিও।

মাদারপুরের কৃষক আব্দুস সালাম এক হাজার ১০০ টাকায় শ্রমিক পেলেও অনেক কৃষককে এক হাজার ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিতে হয়েছে।

বড় নারায়ণপুর এলাকার কৃষক মো. হোসেন আলী ১৫ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছেন। তিনি বলেন, গত শনিবার ছয়জন শ্রমিক দিয়ে জমির একাংশের ধান কাটাতে হয়েছে। প্রতিজনকে এক হাজার ৫০০ টাকা করে মজুরি দিতে হওয়ায় এক দিনেই খরচ হয়েছে নয় হাজার টাকা।

গাংগুটিয়া ইউনিয়নের বড়নালাই এলাকার কৃষক নবীন ব্যাপারী বলেন, শ্রমিকের হাটে শ্রমিক নেই। যারা আছে তারাও অতিরিক্ত টাকা চাইছে। কোনো বেলায় শ্রমিকের বাজার এক হাজার ২০০, আবার কোনো বেলায় এক হাজার ৫০০ টাকা। এক মণ ধানের চেয়ে শ্রমিকের দাম অনেক বেশি।

ধান কাটছেন দুই শ্রমিক।
ধান কাটছেন দুই শ্রমিক।

কৃষকরা বলছেন, উৎপাদন খরচ যেভাবে বেড়েছে, তাতে ধান চাষ আগের মতো লাভজনক নেই। এক সময় ধান চাষে লাভ থাকলেও বর্তমানে হিসাব অনেকটাই বরাবর। লাভের চেয়েও এখন ধান চাষের বড় কারণ বছরজুড়ে পরিবারে ভাতের চাহিদার জোগান দিতে পারা।

ধামরাইয়ের রোয়াইল এলাকার কৃষক জসীম উদ্দিন একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ধান চাষ করে এখন বছরের খাবারের জোগান আসে। কিন্তু লাভ হয় না। তাও জমি তো পতিত রাখা যাবে না। চাষ তো করতে হবে। তাই চাষ করি।

তার মতে, শ্রমিকসংকট কমানো এবং সারসহ কৃষি উপকরণের দাম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ধান চাষ কিছুটা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। না হলে অনেক কৃষকই ধান চাষ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন।

সংকটের সমাধান কোথায়

ধামরাই উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর উপজেলায় ১৭ হাজার তিন হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। গত বছর যা ছিল ১৬ হাজার ৯৯০ হেক্টর। চলতি মৌসুমে ৯৫ হাজার ৫০০ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

ধামরাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আরিফুর রহমান বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে তিনটি মাঠে ৪০ বিঘা করে জমিতে খামারি অ্যাপের মাধ্যমে সুষম সার প্রয়োগ ও নিবিড় পরিচর্যা করা হয়েছে। পাশাপাশি পার্টনার প্রকল্পের এ ডব্লিউ ডি প্রযুক্তি ও ঢাকা অঞ্চল কৃষি উন্নয়ন প্রকল্পের আধুনিক বীজ ও প্রযুক্তি সহায়তা কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে উৎপাদন বৃদ্ধিতে।

এই কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ধান চাষে পরিশ্রম বেশি, লাভ কম হলেও ধানের জমি অন্য ফসলে দখল না হোক। অনেকে সরিষা কেটে জমিতে বোরো ধান আবাদ করে। ফলে সার কম লাগে। তাই কৃষক ধান উৎপাদনে আগ্রহী থাকে।

বাংলাদেশ কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য লাকী আক্তার বলেন, উৎপাদনে ব্যবহৃত উপকরণের দাম বেড়েই চলেছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বাড়লেও কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্যের কারণে কৃষক তার উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। সরকার নির্ধারিত দামে অধিকাংশ কৃষক ফসল বিক্রি করতে পারেন না; নানা শর্তের বেড়াজালে পড়ে তারা ভুক্তভোগী হন।

সরকারি উদ্যোগে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ফসল কেনা, জেলা পর্যায়ে সরকারি হিমাগার নির্মাণ এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা গেলে ধান চাষে কৃষকের আগ্রহ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করেন লাকী আক্তার।

তিনি বলেন, কৃষিকে শুধু বাজারে ব্যবস্থায় ছেড়ে দিলে চলবে না; খাদ্য উৎপাদনকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। কৃষিতে পর্যাপ্ত ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিতে হবে এবং কৃষিনির্ভর শিল্প কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কারণ কৃষিই বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে রাখবে।