‘কাকা, একটা বাচ্চা পড়ে আছে’—জঙ্গলে অপ্রতিমকে যেভাবে পেলেন জিলানী

‘কাকা, একটা বাচ্চা পড়ে আছে’—ভাতিজার এমন কথায় লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গলে এগিয়ে যান স্থানীয় শ্রমিক মোহাম্মদ আবদুল কাদের জিলানী। সেখানে গিয়ে মাথার কাছে রক্তাক্ত অবস্থায় এক শিশুকে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। ভয় পেয়ে বাঁশ কাটার কাজ ফেলে সেখান থেকে চলে যান জিলানী। পরে জানতে পারেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের নিখোঁজ ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিম (১৩) ওই শিশু।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্কের পাশের জঙ্গলে বাঁশ কাটতে গিয়ে অপ্রতীমকে পড়ে থাকতে দেখেন জিলানী ও তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন।
পেশায় শ্রমিক জিলানী বলেন, আমরা কাজ করার জন্য আসছিলাম। কাজের জন্য বাঁশ লাগব। তাই বাঁশ কাটতে এদিক দিয়ে যাইতেছিলাম। যাওয়ার সময় ভাতিজা কইছে, কাকা, একটা বাচ্চা পড়ে আছে। পরে এখানে আইসা দেখি, মাথার দিকে রক্ত। আমরা ভয় পাইয়া গেছি। কাজ (বাঁশ কাটা) ফালাইয়া দিয়া চইলা গেছি।
জিলানী জানান, তার কাছে সময় দেখার মতো কোনো মোবাইল ফোন বা ঘড়ি ছিল না। তবে সূর্যের অবস্থান দেখে তার ধারণা, সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বেলা সাড়ে ১১টার মধ্যে তিনি শিশুটিকে দেখতে পান।
জঙ্গল থেকে সড়কে ওঠার পর জিলানীর সঙ্গে মামুন নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির দেখা হয়। তখন মামুনের কাছ থেকে জানতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের সন্তান নিখোঁজ। পরে মামুনকে সঙ্গে নিয়ে আবার ঘটনাস্থলে যান জিলানী। তিনি বলেন, ‘মামুন ভাই কইল, ম্যাডামের বাচ্চা হারাইছে। তখন আমি বলি ওইখানে একটা বাচ্চা পড়ে রইছে। পরে মামুন ভাই আমারে নিয়ে আবার এখানে আসে। এরপর দেখি এইটাই সেই বাচ্চা।’
অপ্রতিম কোটবাড়ি এলাকার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ি এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকত সে। ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতীম।
এর আগে, শুক্রবার দুপুরে কোটবাড়ি এলাকার বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। পরিবারের ভাষ্য, বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে সে মায়ের আইফোন নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি। অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। পরে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট কোটবাড়ি ও আশপাশের এলাকার ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) ফুটেজসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই শুরু করে।
শনিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও এখনও পাওয়া যায়নি।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এম শরিফুল করিম জানান, সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইল মেসেজের সূত্র ধরেই পুলিশ সন্দেহভাজন ওই কিশোরকে আটক করেছে।
এ বিষয়ে কোটবাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) মহিবুল আলম ভূঁইয়া বলেন, তদন্তের স্বার্থে এবং সিসিটিভি ফুটেজ ও মেসেজের সত্যতার ভিত্তিতে সন্দেহভাজন হিসেবে এক কিশোরকে আটক করা হয়েছে। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছে তা বিস্তারিত তদন্তের পর বলা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, অপ্রতিমের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অপ্রতীমের মৃত্যুর কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে আটক কিশোরের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে।


