মশায় অতিষ্ঠ লক্ষ্মীপুর পৌরবাসী, ডেঙ্গু আতঙ্ক

লক্ষ্মীপুর পৌর এলাকায় আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে মশার উপদ্রব। দিন-রাত মশার কামড়ে চরম অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন পৌরবাসী। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর মশার আক্রমণ তীব্র হওয়ায় শিশু, বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। এরই মধ্যে জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীর মৃত্যু এবং নতুন করে সাতজন আক্রান্ত হওয়ায় মশাবাহিত রোগ নিয়ে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
পৌরবাসীর অভিযোগ, ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকা, খালে বর্জ্য ফেলা, জলাবদ্ধতা, ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করা এবং নিয়মিত মশার ওষুধ না ছিটানোর কারণে মশার বিস্তার দিন দিন বাড়ছে। তাদের দাবি, কাগজে-কলমে কর্মসূচি নয়, মশা নিধন ও পরিচ্ছন্নতায় তারা চান দৃশ্যমান ও নিয়মিত কার্যক্রম।
লক্ষ্মীপুর পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মশার ওষুধ স্প্রে বাবদ বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ ৪১ হাজার ৫৩৭ টাকা। চলতি অর্থবছরে এ বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ৮১ হাজার টাকায়। অর্থাৎ আগের অর্থবছরের তুলনায় বরাদ্দ বেড়েছে ১২ লাখ ৩৯ হাজার ৪৬৩ টাকা, যা প্রায় ৪ দশমিক ৬৩ গুণ। তবে বরাদ্দ কয়েক গুণ বাড়লেও মশার উপদ্রব কমছে না বলে অভিযোগ পৌরবাসীর।
সরেজমিনে দেখা যায়, ২৮ দশমিক ২৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ১৫টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর পৌরসভার অধিকাংশ সড়কের পাশে রয়েছে উন্মুক্ত ড্রেন। অনেক স্থানে ড্রেনে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা ও স্থির পানি। কোথাও কোথাও ড্রেনের পানি চলাচল বন্ধ হয়ে রয়েছে। এতে দুর্গন্ধের পাশাপাশি মশার প্রজননের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর পৌর বাস টার্মিনাল, মদিন উল্যাহ হাউজিং, সরকারি কলেজ এলাকা, হাসপাতাল রোড, নিউ মার্কেট, লক্ষ্মীপুর আইডিয়াল কলেজ, স্টেডিয়াম রোড, লক্ষ্মীপুর আদর্শ সামাদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকা ও হাসপাতাল সড়কে মশার উপদ্রব সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পৌর শহরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সোহেল মিয়া বলেন, মশা এত বেশি যে ঘরে থাকাও কষ্টকর হয়ে গেছে। শুধু বাইরে নয়, ঘরের ভেতরেও শান্তিতে থাকা যায় না। ড্রেন পরিষ্কার না করায় মশার উপদ্রব দিন দিন বাড়ছে।
৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুদীপ্ত দাস বলেন, দিনের বেলাতেও মশারি টাঙিয়ে শুতে হয়। আমরা নিয়মিত পৌরকর দিচ্ছি, কিন্তু মশা নিধনে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
একই ওয়ার্ডের করিম মিয়া বলেন, মশার জ্বালায় বসে থাকাই দায়। ডেঙ্গু নিয়েও মানুষ আতঙ্কে আছে। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
শাখারীপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিতারানী বলেন, দিন-রাত মশার জ্বালায় থাকা যায় না। মশার কামড়ে শরীর ফুলে যায়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী তানভীর আহসান বলেন, প্রায় এক বছর ধরে মশার উপদ্রব অনেক বেশি। সন্ধ্যা হলেই অতিষ্ঠ হতে হয়। কয়েল, ধোঁয়া কিছু দিয়েই কাজ হচ্ছে না।
হাসপাতাল রোডের বাসিন্দা আরজু বলেন, শুধু রাতে নয়, দিনেও ঘর একটু অন্ধকার হলেই মশা কামড়াচ্ছে। অনেক সময় দিনেও মশারি ব্যবহার করতে হচ্ছে।
চিকিৎসাধীন ১৯, ডেঙ্গুতে কিশোরীর মৃত্যু
মশার উপদ্রবের মধ্যে লক্ষ্মীপুরে ডেঙ্গু পরিস্থিতিও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে সাতজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ১৯ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাবে, গত কয়েক মাসে সদর, কমলনগর, রায়পুর ও রামগঞ্জ উপজেলায় মোট ৮০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ৩২ জন, কমলনগরে ৩ জন, রায়পুরে ১ জন এবং রামগঞ্জে ৪৪ জন।
বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১৯ জনের মধ্যে সদর উপজেলায় ৭ জন, রায়পুরে ৫ জন, রামগঞ্জে ৫ জন ও রামগতিতে ২ জন রয়েছেন। এ পর্যন্ত ৬৯ জন চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
এরই মধ্যে ডেঙ্গু ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১২ বছর বয়সী নুসরাতের মৃত্যু হয়েছে। নুসরাত লক্ষ্মীপুর পৌর শহরের মোবারক কলোনিতে বসবাসরত কমলনগর উপজেলার চর লরেঞ্চ গ্রামের নুর হোসেনের মেয়ে। পরিবারের সদস্যদের দাবি, ৯ সেপ্টেম্বর রাতে জ্বর ও ডেঙ্গু আক্রান্ত অবস্থায় তাকে লক্ষ্মীপুরের নগর প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নুসরাতের স্বজনদের অভিযোগ, রাত ১২টার দিকেও তার শারীরিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো ছিল। তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য কোনো হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের জানাননি। পরে হঠাৎ তার মৃত্যু হয়।
পরিবারের আরও অভিযোগ, মৃত্যুর পর নুসরাতের ইসিজি বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন তাদের দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া হাসপাতালের প্যাডে সাদা কাগজে স্বজনদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। নুসরাতের স্বজনরা ঘটনার তদন্ত করে চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি বা অবহেলা হয়ে থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে চিকিৎসা-সংক্রান্ত সব নথি ও প্রতিবেদন পরিবারের কাছে দেওয়ার দাবি তাদের।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নগর হাসপাতাল প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুল রাজ্জাক বলেন, নুসরাতের আগে থেকেই বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা ছিল। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে নোয়াখালী নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। হাসপাতালে চিকিৎসায় কোনো অবহেলা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে স্বজনদের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।
শুরু হয়েছে পরিচ্ছন্নতা অভিযান
ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও এডিস মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে লক্ষ্মীপুরে শুরু হয়েছে ‘ডেঙ্গু মশা নিধন কর্মসূচি-২০২৬’। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে এবং লক্ষ্মীপুর পৌরসভার সহযোগিতায় শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। কর্মসূচির উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসান। এ সময় পুলিশ সুপার মো. আবু তারেক, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা, জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্কাউট সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

কর্মসূচির অংশ হিসেবে এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল চিহ্নিত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রম চালানো হয়। পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতন করা হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, বিএনসিসি ও স্কাউট সদস্যরাও পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিধন কার্যক্রমে অংশ নেন।
লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অরূপ পাল বলেন, পানি জমে থাকলে মশার প্রজনন দ্রুত বাড়ে। এতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তাই বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখা, পানি জমতে না দেওয়া, নিয়মিত মশারি ব্যবহার এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, ফগিং একমাত্র স্থায়ী সমাধান নয়। গত সপ্তাহে জেলায় তিনজন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। আগামী দুই মাসে ডেঙ্গুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এজন্য লার্ভা ধ্বংস, জলাবদ্ধতা নিরসন, আবর্জনা অপসারণ ও জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
লক্ষ্মীপুর পৌরসভার কনজারভেটিভ পরিচ্ছন্নতা সুপারভাইজার মাসুম রেজা সুমন বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে মাসব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মশার ওষুধ স্প্রে করা হচ্ছে।
মশার উপদ্রবের কথা স্বীকার করে পৌর প্রশাসক সম্রাট খীসা বলেন, বর্ষা মৌসুমকে সামনে রেখে ডেঙ্গুর ঝুঁকি মোকাবিলায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পৌর শহরের বিভিন্ন স্থানে মশার ওষুধ স্প্রে করা হয়েছে। পাশাপাশি মাসব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচিও হাতে নেওয়া হয়েছে।


