logo

আগাম আলু চাষে মাঠে কৃষক, কাটেনি আগের লোকসানের শঙ্কা

কুরবান আলী
দিনাজপুর
আগাম আলু চাষে মাঠে কৃষক, কাটেনি আগের লোকসানের শঙ্কা
আগাম আলু চাষে মাঠে দিনাজপুরের কৃষকরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

দিনাজপুর সদর উপজেলার ৬ নম্বর আউলিয়াপুর ইউনিয়নের উলিপুর গ্রামের কৃষক কাশেম আলী। গত মৌসুমে নিজের এক বিঘা জমিতে আগাম আলুর আবাদ করেছিলেন তিনি। উৎপাদনও হয়েছিল ভালো। পাশাপাশি বাজারে দামও ভালো পেয়েছিলেন। এরপর বর্গা নেওয়া তিন বিঘা জমিতে আলুর আবাদ করেন। বিএডিসি থেকে আলুর বীজ না পেয়ে বাজার থেকে বেশি দামে বীজ কেনেন। সার ও কীটনাশকসহ সব মিলিয়ে খরচ হয় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। ওই জমিতেও আলুর ফলন ভালো হয়েছিল। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি তিনি।

কাশেম আলী বলেন, তিন বিঘা জমি থেকে ৯০ মণ আলু উৎপাদন হয়েছিল। বাজারে দাম কম থাকায় আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করি। সেখানে প্রতি কেজিতে খরচ হয় ছয় টাকা। কিন্তু হিমাগারে রাখার পর দিন দিন আলুর বাজারদর কমতে থাকে। ক্ষেত থেকে হিমাগার পর্যন্ত পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ করে প্রতি কেজি আলুতে তার মোট খরচ দাঁড়ায় ২০ টাকা। অথচ বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকা কেজি দরে। ফলে প্রতি কেজি আলু বিক্রি করে তাকে আট থেকে ১০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

এক মৌসুমে আলু উৎপাদন করে তার লোকসান হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার টাকা। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ও ধারদেনা করে আলুর আবাদ করার পর এখন প্রায় পথে বসার অবস্থা তার। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে আগাম আলু রোপণ। তাই ৩৬ হাজার টাকা লোকসানের বোঝা মাথায় নিয়েই আবার আগাম আলু রোপণে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ৬০ বছর বয়সী কৃষক কাশেম আলী।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

গত মৌসুমে দিনাজপুরে রেকর্ড পরিমাণ আলু উৎপাদিত হলেও কাশেম আলীর মতো এমন অনেক কৃষক লোকসানে পড়েছেন। মূলত বাজারে আলু ওঠার পর আশঙ্কাজনক হারে দাম কমতে থাকায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেন। কিন্তু হিমাগারে আলু রেখে তাদের লোকসানের বোঝা আরও বেড়েছে। লোকসানের সেই বোঝা মাথায় নিয়ে চলতি মৌসুমেও আগাম আলু রোপণে ব্যস্ত কৃষকরা।

চলতি মাসের (অক্টোবর) দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে দিনাজপুরে শুরু হয়েছে আগাম আলু রোপণের কর্মযজ্ঞ। সরেজমিনে উলিপুর ও ঘুঘুডাঙ্গা গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, আগাম জাতের ধান কাটার পর কৃষকরা জমি প্রস্তুত করছেন। আবার কেউ কেউ ইতিমধ্যে জমি প্রস্তুত করে আগাম জাতের কার্ডিনালসহ বিভিন্ন জাতের আলুর বীজ রোপণ করছেন। তবে আগাম আলুর আবাদ করেও ভালো দাম পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তায় রয়েছেন কৃষকরা।

ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামের কৃষক জুয়েল ইসলাম বলেন, গত বছর আলুর আবাদ করে সব কৃষকই লোকসান করেছেন। এবার আলুর বীজ, সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় আগাম জাতের আলু চাষে ব্যয় বেড়েছে। তবুও আমরা কৃষকরা আগাম জাতের আলু চাষ করে ভালো লাভের স্বপ্ন দেখছি। গতবার আলুতে যে লোকসান হয়েছে, তা এবার আগাম জাতের আলু চাষ করে পুষিয়ে নিতে পারব বলে আশা করছি।

আরেক কৃষক হাসান বলেন, অধিকাংশ কৃষক প্রস্তুত করা জমিতে আলুর বীজ রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আমি ক্ষেতে সানশাইন ও বারি-৭ জাতের আলুর বীজ রোপণ করেছি। গতবারের তুলনায় আলুর বীজের দাম অনেক কম। কিন্তু তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে। গত বছর যে গোবর সার এক ট্রলি এক হাজার টাকায় কিনেছি, এবার তা কিনতে হয়েছে এক হাজার ২৫০ টাকায়। শ্রমিকদের মজুরিও বেড়ে গেছে।

কৃষক কাশেম আলী জানান, গত মৌসুমে আলুর আবাদ করে বড় অঙ্কের লোকসান হয়েছে। কিন্তু লোকসান হলেও আমি তো একজন কৃষক। তাই কষ্ট করে হলেও আগাম আলুর আবাদ করছি। আগাম আলুর ভালো দাম পেলে লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নিতে পারব।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলায় ৪৮ হাজার ৭৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু চাষ হবে ১২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। এখন পর্যন্ত জেলার ১৩টি উপজেলায় চার হাজার হেক্টর জমিতে আগাম জাতের আলুর বীজ রোপণ শেষ করেছেন কৃষকরা। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আগাম আলুর বীজ রোপণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এসব আগাম জাতের আলু বাজারে উঠবে।

দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, কৃষকরা কখনো জমি ফেলে রাখেন না। আগাম জাতের ধান কাটার পর সেই জমিতে আগাম জাতের আলু রোপণ করেন। আগাম জাতের আলু আবাদ করে কৃষকরা লাভবান হন। এরই মধ্যে অনেক কৃষকের আলুবীজ রোপণের ১০ থেকে ১২ দিন পার হয়েছে। তাদের রোপণ করা বীজ থেকে ছোট ছোট গাছ বের হতে শুরু করেছে। সারিবদ্ধভাবে গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া হচ্ছে। বাংলা নবান্নের অগ্রহায়ণের প্রথমেই নতুন আলু দিয়ে নবান্ন উৎসব হবে বলে অনেক আলুচাষি আশা করছেন।