কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে কাজ শেষের আগেই চূড়ান্ত বিল উত্তোলন

কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলায় সরকারি ভবন সংস্কারের কাজ শেষ না করেই কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে চূড়ান্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। তবে উপজেলা প্রকৌশলীর দাবি, কাজ যথাযথভাবে বুঝে নিয়েই বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিষদ চত্বরে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে চারটি ভবনের কক্ষ, রান্নাঘর, টয়লেট, দরজা-জানালা সংস্কার এবং ভবনের ভেতর-বাইরে ও গ্রিলে রং করার কাজ চলমান রয়েছে। এসব কাজের জন্য প্রায় ২৮ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কাজগুলো পায় কুড়িগ্রাম সদরের রিফাত ট্রেডার্স ও ঠিকাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন।
অভিযোগ রয়েছে, কাজ শেষ না হলেও এবং কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের আগেই গত ১৬ মার্চ পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ‘ম্যানেজ’ করে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়া হয়।
উপজেলা প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে পুরবি কোয়ার্টারের জন্য ১টি ওয়াশ বেসিন, ৩টি আয়না, দরজার ৬টি চৌকাঠ ও ৪টি পাল্লা, জানালার ৪টি চৌকাঠ ও পাল্লা, ৬টি সিলিং ফ্যান এবং প্লাস্টার কাজের বরাদ্দ রয়েছে।
তটনী কোয়ার্টারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২টি ওয়াশ বেসিন, ৩টি আয়না, দরজার ৬টি চৌকাঠ ও ৩টি পাল্লা, জানালার ২টি চৌকাঠ ও পাল্লা, ৭টি সিলিং ফ্যান এবং রান্নাঘরের ঢালাই কাজ।
অন্যদিকে গেজেটেড অফিসার কোয়ার্টারের জন্য ২টি ওয়াশ বেসিন, ২টি প্লাস্টিকের দরজা, রান্নাঘরে টাইলস বসানো, দরজার ৬টি চৌকাঠ ও ৪টি পাল্লা এবং জানালার ৪টি চৌকাঠ ও পাল্লার কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এ ছাড়া নন-গেজেটেড অফিসার কোয়ার্টারের জন্য টয়লেটের ঢালাই, প্যান স্থাপন, টাইলস বসানো, দরজার ৬টি এবং জানালার ৬টি চৌকাঠের কাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সব ভবনের গ্রিল, দরজা-জানালার রং করা এবং পুকুরে একটি গাইড ওয়াল নির্মাণের জন্য পৃথকভাবে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে বাসিন্দাদের অভিযোগ, কাজের মান অত্যন্ত নিম্নমানের এবং অনেক কাজই অসম্পূর্ণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, নামমাত্র কাজ করা হয়েছে। অনেক দরজা-জানালা ভাঙা, রং করা হয়েছে দায়সারা।
তটনী কোয়ার্টারের আনসার কমান্ডার আবুল খায়ের বলেন, আমাদের এখানে কোনো বেসিন লাগানো হয়নি। শুধু কিছু ফ্যান দেওয়া হয়েছে, আর আংশিক রং করা হয়েছে।
গেজেটেড অফিসার কোয়ার্টারের রাঁধুনি ফুলি বেগম বলেন, রান্নাঘরে টাইলস লাগানো হয়নি। শুধু দরজা পরিবর্তন করা হয়েছে।
কাজের সঙ্গে যুক্ত এক রংমিস্ত্রি মজিবর রহমান জানান, আমরা এখানে দরজা, গ্রিলসহ ভবনের রংয়ের কাজ করছি। অনেক ভবনের দরজা-জানালার আংশিক চৌকাঠ পরিবর্তন করা হয়েছে। আবার কিছু দরজা, জানালা চৌকাঠ পুরোটাই পরিবর্তন করা হয়েছে।
উপজেলার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী দুখু মিয়া বলেন, এখনও ৪টি ভবনের কাজ চলমান। আমি এসব কাজের দেখভাল করছি। বিল তোলা হয়েছে কি না, তা জানা নেই।
এদিকে খাদিজা ট্রেডার্সের প্রতিনিধি ফয়জার রহমান অভিযোগ করেন, আগের অর্থবছরে তাদের প্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষর জাল করে উপজেলা প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার জামানতের এক লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই বিষয়ে ইউএনওকে বলা হলেও পরবর্তীতে তিনি টাকা ফেরতের ব্যাপারে অপরাগতা প্রকাশ করেন।
ঠিকাদার আনিসুর রহমান বলেন, কাজ পুরো শেষ হয়নি, প্রথম ধাপে বিল পেয়েছি। তবে কত টাকা পেয়েছেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত বলেননি।
অন্য ঠিকাদার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, আমি ও আমার পার্টনার মিলে কাজটি করেছি। কাজ শেষ হয়েছে কিনা কিংবা বিল পেয়েছি কিনা এই তথ্যগুলো আপনি অফিস থেকে নেন বলেই ফোন কেটে দেন।
উলিপুর উপজেলা প্রকৌশলী প্রদীপ কুমার বিল প্রদানের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বিল দেওয়া হয়েছে কি না, সেটি বড় বিষয় নয়। কাজ ঠিকভাবে হয়েছে কি না সেটি গুরুত্বপূর্ণ। কোথাও সমস্যা থাকলে ঠিক করে দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান ও জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মন্তব্য পাওয়া যায়নি।