Advertisement

লোডশেডিং নিয়ে ভিডিও বার্তা দিয়ে চাকরি হারালেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মী

এশিয়া পোস্ট নিউজ, মাদারীপুর
লোডশেডিং নিয়ে ভিডিও বার্তা দিয়ে চাকরি হারালেন পল্লী বিদ্যুতের কর্মী
চাকরিচ্যুত সুমন হোসেন। ছবি: সংগৃহীত

লোডশেডিং ও গ্রাহকদের দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন পল্লী বিদ্যুতের এক কর্মী। সেই ভিডিওই শেষ পর্যন্ত তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিডিও প্রকাশের কারণে চাকরি হারিয়েছেন মাদারীপুর সদরের বাহাদুরপুর ইউনিয়নের পল্লী বিদ্যুতের সেই কর্মী সুমন হোসেন।

Advertisement

গত বুধবার (১২ আগস্ট) তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। তিনি মিঠাপুর জোনের লাইনম্যান পদে কর্মরত ছিলেন।

সুমন হোসেন তার ‘বিদ্যুৎ প্রতিদিন’ পেজ থেকে বিভিন্ন সময় দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও লোডশেডিং নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন। তার দাবি, গ্রাহকদের কাছে বিদ্যুৎ সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

তবে তার প্রকাশ করা ভিডিও নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হলে বিষয়টি পল্লী বিদ্যুতের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে আসে। এরপর তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

চাকরি হারানোর পর নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জেলা পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) সুশান্ত রায়ের কাছে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন সুমন হোসেন। তার দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর ও কর্মীদের ওপর হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছিল। মিঠাপুরেও যাতে এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে চিন্তা থেকেই তিনি ভিডিও করেছিলেন।

সুমন বলেন, ‘আমি অফিসের কথা ভেবেই ভিডিওটি করেছিলাম। সাধারণ মানুষকে বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি বোঝানো এবং সম্ভাব্য অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানোই ছিল উদ্দেশ্য। কিন্তু বিষয়টি এত দূর গড়াবে, সত্যিই বুঝতে পারিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার একটি ভিডিও আমি, আমার পরিবার ও কর্মস্থলের জন্য এত বড় সমস্যার কারণ হবে, তা ভাবিনি। আমার কথা বা কাজে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি দুঃখিত।’

ভবিষ্যতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্যুৎসংক্রান্ত কোনো ভিডিও বা পোস্ট প্রকাশ করবেন না বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, ‘আমি আর কোনো দিন বিদ্যুৎ বিষয়ে কোনো পোস্ট বা ভিডিও আপলোড করব না। সবাই আমার ও আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন।’

লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি গ্রাহকদের

এ ঘটনায় মাদারীপুরে ঘনঘন লোডশেডিংয়ের কারণে গ্রাহকদের দুর্ভোগের বিষয়টি সামনে এসেছে নতুন করে। তীব্র গরমের মধ্যে দিনের বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বিপাকে পড়ছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। পাশাপাশি শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের কাজেও এর প্রভাব পড়ছে।

বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে গ্রাহকদের। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বাসা বাড়িতে ব্যবহৃত ফ্রিজ, ফ্যান, পানির পাম্পসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রেরও ক্ষতি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। এতে ব্যাহত হচ্ছে দৈনন্দিন কাজ।

স্থানীয় একাধিক গ্রাহকের মতে, বিদ্যুৎ নিয়ে অসন্তোষ থাকলেও মাঠকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা হামলা কোনো সমাধান নয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের অভিযোগকে অবহেলা না করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি।

মিঠাপুর এলাকার বাসিন্দা এহসান আজগর বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন ফিরবে বোঝা যায় না। গরমের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কষ্ট হয় শিশু ও বয়স্কদের। দোকানপাটেও কাজের সমস্যা হয়।

অনার্স পড়ুয়া এক শিক্ষার্থী জামিলা আক্তার বলেন, পরীক্ষার সময় রাতে বিদ্যুৎ না থাকলে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। লোডশেডিংয়ের সময়সূচি আগে জানা গেলে অন্তত পড়াশোনার সময়টা পরিকল্পনা করা যায়।

দুধখালী বাজারের ফটোকপি দোকানদার আলী আহমেদ জানান, বিদ্যুৎ না থাকলে দোকানের অনেক কাজ বন্ধ রাখতে হয়। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য কয়েক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকা আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাহাদুরপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আবুল বাশার মুন্সী এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের সমস্যা থাকলে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো উচিত। কর্মীদের ওপর হামলা বা অফিসে ভাঙচুর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আবার গ্রাহকদের সমস্যার কথাও গুরুত্ব দিয়ে শুনতে হবে।

পল্লী বিদ্যুতের জেনারেল ম্যানেজার সুশান্ত রায় এশিয়া পোস্টকে বলেন, সুমন হোসেন মিঠাপুর জোনে লাইনম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন। লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বিভিন্ন ভিডিও প্রকাশের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এসব ভিডিওকে কেন্দ্র করে গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির অভিযোগ ওঠায় তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

সুমনের ঘটনাটি তাই শুধু একজন কর্মীর চাকরি হারানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ বিভাগের মাঠকর্মীদের দায়িত্ব, গ্রাহকদের ক্ষোভ এবং তথ্য দেওয়ার ঘাটতির প্রশ্নও। গ্রাহকদের অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তি, স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত অবহিত করার ব্যবস্থা থাকলে দুই পক্ষের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি অনেকটাই কমতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।