সুনামগঞ্জ/পানি প্রবাহ নেই, তবু সড়ক কেটে নির্মাণ হচ্ছে কালভার্ট

দৃশ্যমান কোনো পানিপ্রবাহ নেই, নেই খাল কিংবা ছড়া। সড়কের দুই পাশে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। তবু বিটুমিনের সড়ক কেটে নির্মাণ করা হচ্ছে কালভার্ট। অন্তত তিনটি স্থানে সড়ক কেটে ও মাটি খুঁড়ে কালভার্ট নির্মাণের এমন উদ্যোগে বিস্মিত স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের প্রশ্ন, যেখানে পানিপ্রবাহের কোনো পথ নেই, সেখানে কালভার্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু? অথচ সীমান্তের পাহাড়ি ছড়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য পাশেই রয়েছে কালভার্ট।
এমন ঘটনা ঘটেছে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়া বাজার পর্যন্ত বিস্তৃত সীমান্ত সড়কের সংস্কারকাজে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন এই প্রকল্পে পাঁচটি সেতু ও ১০টি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ৪২ কোটি ৯৫ লাখ ২৮ হাজার ৩৩১ টাকা ব্যয়ে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের সংস্কারকাজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে এই সড়কে নতুন করে তিনটি কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স চৌধুরী এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স নুর কনস্ট্রাকশন ইতিমধ্যে সড়ক ও কালভার্ট নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। বর্তমানে সড়কটির প্রশস্ততা ১২ ফুট। সংস্কার ও সম্প্রসারণের পর এটি ১৮ ফুট প্রশস্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশে ৩ ফুট করে মোট ৬ ফুট শোল্ডার যুক্ত করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সড়ক উন্নয়নের নামে অপ্রয়োজনীয় দুটি কালভার্ট নির্মাণে ব্যয় হতে পারে প্রায় ৮০ লাখ টাকা। সমালোচনার মুখে একটি কালভার্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে এলজিইডি। তবে বাকি দুটি কালভার্টের নির্মাণকাজ চলছে। এ দুটি কালভার্ট নির্মাণে অন্তত ৮০ লাখ টাকা ব্যয় হবে বলে জানিয়েছেন এলজিইডির তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম। তার দাবি, পাহাড়ি ঢলের পানি সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ কারণে কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সড়ক সংস্কারের সময় তাদের সঙ্গে আলোচনা না করে এবং যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়াই চানপুর বাজারের কাছে বিটুমিনের সড়ক কেটে একাধিক কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ পাশের পাহাড়ি ছড়ার পানি নিষ্কাশনের জন্য ওই সড়কে আগে থেকেই কালভার্ট রয়েছে। নতুন করে তিনটি কালভার্ট নির্মাণের উদ্যোগে সরকারি অর্থের অপচয়ের আশঙ্কা করছেন তারা।
এ ছাড়া সড়ক প্রশস্ত করতে গিয়ে স্থানীয়দের রেকর্ডভুক্ত জমির একাংশ সড়কের আওতায় চলে যাওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এতে জমির মালিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাহিরপুর সীমান্তের ট্যাকেরঘাট থেকে কড়ইগড়ামুখী সড়কের বিভিন্ন অংশে সংস্কারকাজ চলছে। রাজাই গ্রামের অংশে সড়কের দুই পাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি। এরই মধ্যে একটি স্থানে বিটুমিনের আস্তরণ কেটে বড় গর্ত করা হয়েছে। কোথাও কালভার্ট নির্মাণের জন্য মাটি খোঁড়া হয়েছে, আবার কোথাও সড়কের একাংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, কালভার্টগুলোর সামনে ও পেছনে খাল খনন করে দেওয়া হবে, যাতে কালভার্টের নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হতে পারে।
চানপুর গ্রামের বাসিন্দা ও উত্তর বড়দল ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মহিউদ্দিন বলেন, যেখানে সড়ক কেটে নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে আগে কোনো পানিপ্রবাহের পথ ছিল না। এখানে কালভার্ট নির্মাণের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। এখন কালভার্ট নির্মাণের ফলে বর্ষায় পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবাহিত হলে আশপাশের ফসলি জমি ও বসতবাড়ির ক্ষতি হতে পারে।
রাজাই গ্রামের বাসিন্দা দানিয়াল ম্রু বলেন, যেখানে নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, সেখানে আগে কোনো ছড়া বা খাল ছিল না। এখন নতুন করে কালভার্ট নির্মাণ ও খাল খনন করা হবে বলে জানতে পেরেছি। কিন্তু যে জায়গা দিয়ে খাল খনন করতে চাচ্ছে, সেটি আমাদের ফসলি জমি। জমির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে এবং আমরা নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করি। এই জমিতে চাষাবাদ করেই জীবিকা নির্বাহ করি। ফসলি জমি কেটে খাল তৈরি করা হলে আমরা চাষাবাদ থেকে বঞ্চিত হব।
এলাকার বাসিন্দা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক ও পরিবেশকর্মী এন্ডো জুয়েল সলোমার বলেন, প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই, আগে থেকেই সেতু-কালভার্ট থাকার পরও নতুন করে অপ্রয়োজনীয় সেতু-কালভার্ট নির্মাণের মাধ্যমে সরকারি বিপুল অর্থ অপচয় করা হচ্ছে। সড়কটি প্রশস্ত করা হলে আমাদের অনেকের রেকর্ডভুক্ত জমি সড়কের আওতায় চলে যাবে। শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিই নয়, বিভিন্ন মিশন, মাদ্রাসা ও চার্চের জমিও সড়কের মধ্যে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে সড়ক প্রশস্ত করা হলেও অধিগ্রহণের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে লিখিতভাবে জেলা প্রশাসককে জানিয়েছি।
এ বিষয়ে এলজিইডির তাহিরপুর উপজেলা প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বলেন, সড়কের জন্য ম্যাপে ৪৮ ফুট জায়গা উল্লেখ রয়েছে। সড়কটি ২৬ ফুট প্রশস্ত হবে। এরপরও এলজিইডির নিজস্ব জায়গা থাকবে। যারা ব্যক্তিগত জমি দাবি করছেন, তাদের অধিকাংশই মূলত না জেনে এসব কথা বলছেন। সড়কটিতে নতুন করে তিনটি কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। স্থানীয়দের আপত্তির পর একটি কালভার্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিল করা হয়েছে। এখন দুটি নতুন কালভার্ট নির্মাণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলেই কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। বর্ষায় আকস্মিক পাহাড়ি ঢল নামলে পানি সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। কালভার্ট নির্মাণ করা হলে পানি চলাচলের সহজ পথ তৈরি হবে। পর্যাপ্ত কালভার্ট না থাকলে পানির চাপে সড়ক ভেঙে যেতে পারে। পানিপ্রবাহ ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে।

