logo

কম খরচে বেশি লাভের আশায় আখ চাষে ঝুঁকছেন ফটিকছড়ির কৃষকেরা

কম খরচে বেশি লাভের আশায় আখ চাষে ঝুঁকছেন ফটিকছড়ির কৃষকেরা
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির পূর্ব সুয়াবিল এলাকায় একটি আখ বাগানে পরিচর্যায় ব্যস্ত কৃষক। ছবি : এশিয়া পোস্ট

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার হালদা নদীর চরে আগে মুলাসহ বিভিন্ন শীতকালীন সবজির আবাদ করতেন কৃষকেরা। এখন সেই জমির অনেকটিতেই চাষ হচ্ছে আখ। তুলনামূলক কম খরচে ভালো লাভের সম্ভাবনা থাকায় বিকল্প ফসল হিসেবে আখ চাষে আগ্রহ বাড়ছে তাদের। ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে আখের খুচরা ও পাইকারি বিক্রি। জমি থেকে আখ কাটা, আঁটি বাঁধা ও বাজারজাত করার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা।

পূর্ব সুয়াবিল এলাকার কৃষক মো. আলমগীর তাদেরই একজন। সীমিত সামর্থ্যের পরিবারে কৃষিকাজই তার আয়ের অন্যতম ভরসা। আগে ভান্ডারী মুলার সঙ্গে সাথি ফসল হিসেবে মিষ্টিকুমড়া চাষ করতেন। এবার নতুন কিছু করার প্রত্যাশায় বেছে নেন আখ চাষ। চলতি মৌসুমে প্রায় দেড় কানি জমিতে ‘রংবিলাস’ জাতের আখ আবাদ করে পেয়েছেন আশাব্যঞ্জক সাফল্য।

আলমগীর জানান, আখের বাগান তৈরি থেকে বিক্রি পর্যন্ত বাঁশ, সার ও শ্রমিকের মজুরিসহ তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। জমিতে আখ থাকা অবস্থাতেই পাইকারের কাছে পুরো উৎপাদিত আখ ১ লাখ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন তিনি। এতে খরচ বাদে তার লাভ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকা।

তবে শুরুতে আখ চাষ নিয়ে স্থানীয় অনেকেই তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। তাদের সংশয় উপেক্ষা করে নিজের উদ্যোগেই চাষ শুরু করেন তিনি। বাগানে ভালো ফলন দেখে এখন আশাবাদী এই কৃষক।

আলমগীর বলেন, নিজের উদ্যোগেই আখ চাষ শুরু করেছি। চাষের শুরু থেকে সময়মতো কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সহায়তা পেয়েছি।

ধান চাষের তুলনায় আখ চাষকে লাভজনক বিকল্প হিসেবে দেখছেন তিনি। তার ভাষ্য, ধান চাষে এখন তেমন লাভ থাকে না। সারের দাম ও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচের সঙ্গে ধানের বিক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য থাকছে না। এ কারণে বিকল্প ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন কৃষকেরা।

হালদা নদীর চরে আলমগীরের মতো আরও প্রায় ২০ জন কৃষক আখ চাষ করেছেন। তাদের অনেকেই আগে ধান, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসল আবাদ করতেন। কম খরচে ভালো আয়ের সম্ভাবনা এবং জমিতে থাকা অবস্থাতেই পাইকারের কাছে আখ বিক্রির সুযোগ তাদের এ চাষে আগ্রহী করে তুলছে।

ফটিকছড়ি উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের আজিমপুর এলাকার কৃষক মো. আমিনুল হকও এবার ১০ শতাংশ জমিতে আখ চাষ করেছেন। স্বল্প পরিসরে আবাদ করেই লাভবান হয়েছেন তিনি। তাঁর মতো কৃষকেরা আখ চাষে সাফল্য পাওয়ায় স্থানীয় পর্যায়ে এ ফসলের আবাদ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

ফটিকছড়ি উপজেলার নাজিরহাট পৌরসভার কুম্ভারপাড়া, সুন্দরপুর ইউনিয়নের আজিমপুর, পূর্ব সুয়াবিল, কাঞ্চননগর, পাইন্দংয়ের ফকিরাচান এবং হারুয়ালছড়ির পিনপিনিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আখের আবাদ হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকার আখচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এবার ফলন ও দাম নিয়ে সন্তুষ্ট অনেক কৃষক। প্রায় এক মাস আগে থেকে আখ বিক্রি শুরু হয়েছে, যা এখনো পুরোদমে চলছে। হালদা নদীর চরে কেউ আখ কাটছেন, কেউ আঁটি বাঁধছেন; অন্য শ্রমিকেরা কাটা আখ সড়কের পাশে স্তূপ করে রাখছেন। সেখান থেকেই চলছে বাজারজাত করার প্রস্তুতি।

কৃষকেরা জানান, পাইকারেরা এখন জমিতে এসেই আখ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে পরিবহন ও বাজারজাতকরণের ঝামেলা কিছুটা কমছে।

ফটিকছড়ি উপজেলার নারায়ণহাট ইউনিয়নের হাঁপানিয়া গ্রামের কৃষকেরা নিজেদের উৎপাদিত আখ নারায়ণহাট বাজারে এনে বিক্রি করছেন। সেখানে প্রতিটি আখ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা দরে। সুস্বাদু ও মিষ্টি হওয়ায় স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে এসব আখের চাহিদাও বেশ ভালো।

আখ বিক্রেতা রফিক বলেন, আগের তুলনায় বাজারে আখের চাহিদা বেড়েছে। এখানকার আখ মিষ্টি হওয়ায় ক্রেতাদের কাছে এর টানা কদর রয়েছে। তাই আমরা কৃষকদের খেত থেকে আখ কিনে বাজারে নিয়ে আসছি। বর্তমানে প্রতিটি আখ ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তবে আকারভেদে এর চেয়ে বেশি দামেও বিক্রি হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে ফটিকছড়িতে ১৩৫ জন কৃষক ১০৪ হেক্টর জমিতে আখ আবাদ করেছেন। এবার রংবিলাস, ফিলিপাইন ও ২০৮ জাতের আখ চাষ হয়েছে। কৃষকদের মধ্যে এ ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়ায় উপজেলার কৃষিতে বিকল্প ফসল হিসেবে আখের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ফটিকছড়ির মাটি ও আবহাওয়া আখ চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তুলনামূলক কম খরচে ভালো ফলন ও লাভের সম্ভাবনা থাকায় কৃষকদের মধ্যে আখ চাষে আগ্রহ বাড়ছে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ১৩৫ জন কৃষক ১০৪ হেক্টর জমিতে আখ আবাদ করেছেন। কৃষকদের আখ চাষে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি উন্নত জাত নির্বাচন, আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি ও রোগবালাই দমনে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে আখের আবাদ আরও সম্প্রসারণে কাজ করবে কৃষি বিভাগ।