logo
Advertisement

বেঁচে থাকার তাগিদে ১০২ বছর বয়সেও হাতে ঝাড়ু

এশিয়া পোস্ট নিউজ, পটুয়াখালী
বেঁচে থাকার তাগিদে ১০২ বছর বয়সেও হাতে ঝাড়ু
জীবিকার তাগিদে হাটে ঝাড়ু দিচ্ছেন আজাহার মোল্লা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে বিশ্রামে থাকার কথা ১০২ বছর বয়সি আজাহার মোল্লার। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে, হাঁটাচলাও কষ্টকর। তবু বেঁচে থাকার তাগিদে হাতে তুলে নিতে হয় ঝাড়ু। সপ্তাহে দুদিন হাটে গিয়ে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করেন তিনি। ব্যবসায়ীরা তাকে ৫ থেকে ১০ টাকা করে দেন। দিন শেষে তা জমে দেড় থেকে দুইশ টাকা। এই সামান্য আয়েই চলছে তার জীবন।

Advertisement

আজাহার মোল্লার বাড়ি পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার দক্ষিণ মুরাদিয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডে। নিজের বলতে এখন আর কেউ নেই। প্রায় ১৫ বছর ধরে পালক মেয়ে মরিয়ম বেগমের সংসারে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। সেই সংসারও অভাবের। পুরোনো কাপড় ফেরি করে তিন সন্তানকে নিয়ে কোনোভাবে সংসার চালান মরিয়ম। এর মধ্যেই বাবার ভরণপোষণের দায়িত্বও তাকে নিতে হচ্ছে।

সম্প্রতি কলবাড়ি হাট ও শ্রীরামপুরের তালুকদার হাটে দেখা যায় আজাহার মোল্লাকে। কখনও বসে, কখনও শরীর নুইয়ে দুই হাতে ঝাড়ু দিয়ে হাট পরিষ্কার করছেন তিনি। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে বা ঝুঁকে কাজ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা তার নেই। তবু জীবিকার প্রয়োজনে কাজ করতে হচ্ছে।

শনিবার ও মঙ্গলবার এসব হাটে ঝাড়ু দেন আজাহার। হাটের ব্যবসায়ীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে ৫ থেকে ১০ টাকা দেন। এভাবেই দিনে দেড় থেকে দুইশ টাকা আয় হয় তার।

আজাহার মোল্লা বলেন, অসুস্থ শরীর নিয়ে এখন আর পারছি না। তারপরও বেঁচে থাকার জন্য হাটে যাই। শনি আর মঙ্গলবার হাটে ঝাড়ু দিই। ব্যবসায়ীরা যে টাকা দেন, তা দিয়ে কোনোভাবে চলি।

একসময় তার ঘরবাড়ি, জমিজমা ও সংসার ছিল। পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের ফ্যালাবুনিয়া গ্রামে ছিল পৈতৃক বাড়ি। যৌবনে বিয়ে করে সংসারও করেছিলেন। কিন্তু প্রায় ৫০ বছর আগে আগুনমুখা নদীর ভাঙনে ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যান তিনি।

আজাহার বলেন, আমার পৈতৃক বাড়ি রাঙ্গাবালী উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের ফ্যালাবুনিয়া গ্রামে ছিল। যৌবনে জমিজমা, ঘরবাড়ি সবকিছুই ছিল। বিয়ে-সাদিও করেছিলাম। কিন্তু কপালে আর সুখ সইল না। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আগুনমুখা নদীতে প্রায় ৫০ বছর আগে সবকিছু বিলীন হয়ে যায়।

সব হারানোর পর তার স্ত্রীও মারা যান। একসময় ভবঘুরের মতো জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। প্রায় ৩০ বছর আগে দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের পরিচয়ে মুরাদিয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সেই সংসারেও কোনো সন্তান হয়নি। প্রায় ১৫ বছর আগে দ্বিতীয় স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে পালক মেয়ে মরিয়মের সংসারে থাকছেন তিনি।

মরিয়ম বেগম বলেন, আমি গরিব মানুষ। পুরোনো কাপড় ফেরি করে কোনোমতে তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার চালাতে হয়। এরপর বাবার ভরণপোষণ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বাবা সরকারি কোনো সাহায্য পান না।

আজাহার জানান, একসময় তিনি বয়স্ক ভাতা পেতেন। বর্তমানে সেই ভাতাও বন্ধ। ফলে সরকারি সহায়তা না থাকায় তার নির্ভরতা বেড়েছে অন্যের সহযোগিতার ওপর।

হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরে আজাহার মোল্লা কলবাড়ি ও তালুকদার হাট পরিষ্কার করে আসছেন। শতবর্ষ পেরিয়েও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। তবে এখন তার কাজ করার চেয়ে সহায়তা পাওয়াটাই বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।

ব্যবসায়ীদের একজন বলেন, এই বয়সে তার কাজ করার কথা নয়। এখন তার সরকারি ও সামাজিক সহায়তা দরকার। জীবনের শেষ সময়ে অন্তত যেন তাকে অন্যের ওপর নির্ভর করে থাকতে না হয়।

মুরাদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান ফোরকান জামান বলেন, আপনাদের মাধ্যমে আমি বিষয়টি জানতে পেরেছি। খোঁজখবর নিয়ে তার জন্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এককালীন সহায়তার পাশাপাশি আজাহার মোল্লার বন্ধ হয়ে যাওয়া বয়স্ক ভাতা পুনরায় চালু করা হোক। নিয়মিত সরকারি সহায়তা পেলে জীবনের শেষ দিনগুলো কিছুটা স্বস্তিতে কাটাতে পারবেন ১০২ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ।

১০২ বছরে আজাহার মোল্লার হারানোর তালিকাটা দীর্ঘ—ঘরবাড়ি, জমিজমা, স্ত্রী ও সংসার। এখন তার সম্বল পালক মেয়ের অভাবের সংসার আর সপ্তাহে দুদিন হাটে ঝাড়ু দিয়ে পাওয়া সামান্য টাকা। বয়স ও শরীর তাকে আর কাজ করতে দিতে চায় না। তবু ক্ষুধা ও বেঁচে থাকার তাগিদে হাটের কোলাহলের এক পাশে নীরবে ঝাড়ু দেন তিনি। কেউ দেন পাঁচ টাকা, কেউ দশ টাকা। সেই সামান্য অর্থই তার কাছে হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার অবলম্বন।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আজাহার মোল্লার চাওয়া খুব বেশি নয়—আর যেন কষ্ট করে কাজ করতে না হয়, জীবনের শেষ দিনগুলো যেন একটু স্বস্তিতে কাটে।