logo

মাংসের নামে কী খাচ্ছে সাভারের মানুষ

শরীফুজ্জামান ফাহিম
সাভার, ঢাকা
মাংসের নামে কী খাচ্ছে সাভারের মানুষ
সাভারের একটি দোকানে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে কাঁচা মাংস। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সপ্তাহজুড়ে কর্মব্যস্ততার পর ছুটির দিনের সকালে বাজারগুলোতে ভিড় জমে ওঠে। প্রিয়জনের মুখে একটু ভালো খাবার তুলে দিতে কসাইয়ের দোকানের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে পছন্দের মাংস কিনে বাসায় নিয়ে যান। কিন্তু যে মাংসটি রান্না হলো তা আসলেই কতটুকু ভালো কিংবা স্বাস্থ্যসম্মত তা নিশ্চিত বলতে পারেন না কেউই। এ ছাড়া খাসির মাংসের নামে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভেড়া। আর ষাঁড়ের কথা বলে গছিয়ে দেওয়া হচ্ছে অসুস্থ বুড়ো গাভী। এমনকি আগের দিনের পচা-বাসি মাংসও হয় বিক্রি।

সাভার ও আশুলিয়া অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় তিন শতাধিক মাঝারি ও বড় বাজার রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী পশু জবাইয়ের আগে প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার কাছ থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে সিলমোহর দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা নেই বললেই চলে। পুরো ব্যবস্থাটিই যেন অভিভাবকহীন। সরকারি ভেটেরিনারি সার্জনদের নিয়মিত পরিদর্শন না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীদের এমন প্রতারণা এখন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। ফলে সাভার ও আশুলিয়ার হাজার হাজার রেস্তোরাঁ ও সাধারণ মানুষের রান্নাঘরে প্রতিনিয়ত পৌঁছে যাচ্ছে অনিরাপদ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ মাংস। শুধু তাই নয়, রোগাক্রান্ত পশুর মাংসের মাধ্যমে অ্যানথ্রাক্সের মতো প্রাণঘাতী ব্যাকটেরিয়ার স্পোর বাসাবাড়িতে পৌঁছে যেতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন বাজার সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কসাইখানা না থাকায় খোলা জায়গায় নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই পশু জবাই ও মাংস কাটাকাটি চলছে। পৌর এলাকায় একটি স্থান থাকলেও নেই কোনো ডাক্তার। এ ছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে কোনো ভবন বা স্থান খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে কবে পরীক্ষা হয়েছে তা জানেন না কেউ। এতে কোনো পরীক্ষা কিংবা যাচাই-বাছাই ছাড়া রাতের আঁধারে হচ্ছে পশু জবাই। এ ছাড়া জবাইখানা ও কসাইখানার অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে ফিকেল ব্যাকটেরিয়াসহ বিভিন্ন প্যাথোজেনিক জীবাণু সরাসরি মানুষের রান্নাঘর পর্যন্ত পৌঁছে খাদ্য বিষক্রিয়া তৈরি করছে।

বলিবদ্র বাজারে আসা রফিকুল ইসলাম নামে এক চাকরিজীবী আক্ষেপ করে বলেন, সপ্তাহের ছুটির দিনে পরিবারের সবাইকে নিয়ে একটু ভালো খাওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে মাংস কিনি। কিন্তু খাসি বললে ধরিয়ে দেয় ভেড়া। আর ভালো গরুর কথা বলে বুড়ো গাভী বা মরা গরুর মাংস দেয়। খোলা জায়গায় কাটাকাটি হয়, বোঝার কোনো উপায় থাকে না।

সাভার নামাবাজারের গৃহিণী শারমিন আক্তার বলেন, মাংসের সাথে রক্ত মাখানো পচা-বাসি মাংস বা অতিরিক্ত চর্বি মিশিয়ে দেওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। বাজারে কসাইদের তদারকি করার কেউ নেই। যার যেভাবে খুশি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের জিজ্ঞাসা করলে বলে আজকেই জবাই করা হয়েছে। আমরা বুঝব কিভাবে কোনটা ভালো বা খারাপ। বাধ্য হয়ে কিনতে হচ্ছে গরুর মাংস।

আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকার এক রেস্তোরাঁ মালিক হাসান জানান, নির্দিষ্ট কসাইখানা বা সরকারি সিল মারার ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে কসাইদের দেওয়া মাংসই কেনেন। মাংসের মান খারাপ হলে দুর্নাম হয় তাদের, আর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ে সাধারণ মানুষ।

সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম জাহান জানান, সাভারের প্রায় ২০ লাখ জনসংখ্যার বিপরীতে সরকারি অর্গানোগ্রামে মাত্র একজন ভেটেরিনারি সার্জন রয়েছেন। এ বিশাল জনসংখ্যার জন্য প্রতিদিন যে পরিমাণ পশু জবাই হয়, তা এককভাবে পরীক্ষা করে সার্টিফিকেট দেওয়া অত্যন্ত দুরূহ কাজ। এ ছাড়া পৌরসভাতেও ভেটেরিনারি সার্জন পদ শূন্য রয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নে আধুনিক কসাইখানা স্থাপন, পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা ও ভেটেরিনারি সার্জনসহ প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগের ওপর জোর দেন তিনি।

ঢাকা জেলা কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল ইসলাম জানান, পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও জবাইপূর্ব তদারকির প্রাথমিক দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ দপ্তরের। তবে জবাইকৃত পশু যখন প্রক্রিয়াজাত হয়ে খাদ্য বা মাংস হিসেবে বাজারে আসে, তখন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নিতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট ও সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে তাৎক্ষণিক যৌথ অভিযান চালিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভা প্রশাসক সাইফুল ইসলাম জানান, সাভার পৌরসভায় একটি কসাইখানা থাকলেও সেখানে স্থায়ী অবকাঠামো নেই এবং এটি ইজারা দেওয়া থাকে। কসাইখানার জন্য নির্ধারিত ‘কসাইখানা ইন্সপেক্টর’ পদটিও বর্তমানে শূন্য রয়েছে। পৌরসভার শূন্য পদগুলোতে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং কসাইখানার অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা চলছে। তা ছাড়া সাভারের বিশাল জনসংখ্যার চাহিদা বিবেচনায় ইউনিয়ন পর্যায়েও ছোট ছোট ‘স্লটার হাউস’ (কসাইখানা) তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। একই সাথে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে মাংসের বাজারগুলোতে নিয়মিত নজরদারি জোরদার করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য ও ইনফরম্যাটিক্স বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আয়েশা আহমেদ বলেন, আমাদের স্থানীয় খোলা বাজারগুলোতে যে কাঁচা মাংস আসছে তার কোনো স্বাস্থ্যগত নিশ্চয়তা নেই। সুস্থ পশু জবাই করা হচ্ছে কি না বা এর কোনো বৈজ্ঞানিক সার্টিফিকেশন হচ্ছে কি না, তা জানার কোনো উপায় নেই। অ্যানথ্রাক্স একটি অত্যন্ত মারাত্মক স্পোর-ফর্মিং ব্যাকটেরিয়া। এই স্পোর সহজে ধ্বংস হয় না ও এগুলো দূর করতে উচ্চ তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। কোনো খামারে অ্যানথ্রাক্স দেখা দিলে পুরো খামার জীবাণুমুক্ত বা স্টেরিলাইজ করতে হয়। ফলে পরীক্ষা ছাড়া আসা মাংস স্পোর-মুক্ত কি না তা ভোক্তারা জানতে পারছেন না। তাই পরীক্ষা করাটা অত্যন্ত জরুরি।