মায়ের কানে আজও বাজে শহীদ তারেকের শেষ ডাক

‘কাজ শেষ কইর্যা বাড়ি অ্যাইনুগে মা’। এই একটি মধুর ডাক শোনার জন্য দীর্ঘ দুই বছর ধরে অপেক্ষায় আছেন এক মা। কিন্তু সেই ডাক ভেসে আসে না চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের এক জীর্ণ ঝুপড়ি ঘরে।
চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে গিয়ে বুলেটে নিভে গেছে ১৮ বছরের উদীয়মান কিশোর তারেকের জীবন। তারেক নেই, কিন্তু তার স্মৃতি হারিয়ে যাওয়া ‘মা’ ডাক আজও কেঁদে ফেরে শোকার্ত মায়ের হৃদয়ে।
পারিবারিক অভাব-অনটন ও প্রায় ১২ লাখ টাকার ঋণের বোঝা কমানোর স্বপ্ন নিয়ে ঢাকায় পাড়ি জমায় ১৮ বছরের কিশোর তারেক। কাজ শুরু করেছিল কাঠমিস্ত্রি হিসেবে। ইচ্ছে ছিল কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের সব ঋণ শোধ করবে, ইট কিনে নতুন ঘর বানাবে, ছোট বোনের বিয়ে দেবে, হাসি ফোটাবে মা-বাবার মুখে।
কিন্তু বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশ গড়ার ডাক যখন এলো, তখন ঘরে বসে থাকতে পারেনি সে। পরিবারকে না জানিয়ে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট থেকে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয় তারেক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানা মোড়ে উল্লাসে মেতে উঠেছিল তারেক। কিন্তু সেই বিজয়ের আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নেয় চরম বিষাদে। আচমকা ধেয়ে আসা বুলেটে রক্তে ভেসে যায় তার দেহ।
রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে তাকে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। টানা চার দিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা শেষে ৯ আগস্ট শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে এই কিশোর। ১০ আগস্ট গ্রামের বাড়ির কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। রাষ্ট্রীয় ‘জুলাই শহীদ’ তালিকার ১০৫ নম্বর ক্রমিকে ঠাঁই হয়েছে তার নামের।
সরেজমিনে শহীদ তারেকের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাত তাদের পিছু ছাড়েনি। যে জীর্ণ ঝুপড়ি ঘর বদলে দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তারেকের, পরিবারটি সেই ভাঙাচোরা ঘরেই বসবাস করছে। তারেকের বাবা আসাদুল ইসলাম ভ্যান চালিয়ে সংসার চালান। বড় ভাই কাজ করছেন রাজমিস্ত্রি হিসেবে। সম্প্রতি তারা শহীদ তারেকের ছোট বোনের বিয়ে দিয়েছেন।
ছেলের স্মৃতি মনে করে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা ফেরদৌসী বেগম। আবেগজড়িত কণ্ঠে আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘দুই বছর হতে চলল আমি ছেলেটার মা ডাক শুনি না। কাজ থেকে ফিরে যে ছেলে মা বলে ডেকে জড়িয়ে ধরত, সেই ডাক আর কোনো দিন শুনতে পাব না। টাকাপয়সা বা সরকারি সাহায্যে আমার ছেলে তো ফিরবে না, যারা আমার ছেলেকে নির্মমভাবে কেড়ে নিয়েছে, আমি শুধু তাদের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’
ছেলের শেষ মুহূর্তের বেদনাময় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বাবা আসাদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরাও সেদিন মিছিলে ছিলাম। খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে দেখি চারপাশ রক্তে ভেসে যাচ্ছে, সে রক্তে আমার স্যান্ডেল আটকে যাচ্ছিল। অপারেশনের পর ছেলেই কথা বলল, পানি চাইল, কিন্তু আর বেঁচে রইল না।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুর রহিম বলেন, আন্দোলন করতে গিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুইজন ঢাকায় শহীদ হয়েছে। আমরা সেই পরিবারগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখি। আমরা চাই যারা জুলাই যোদ্ধা ও শহীদ পরিবার রয়েছে তারা যেন প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পান এবং তাদের পরিবারকে যেন সহযোগিতা করা হয়।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান বলেন, ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার তারেক নামের একজন যুবক শহীদ হয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ৪ শতক জমি দেওয়া হয়েছে। সেখানে একটি সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন করে দেওয়া হয়।
তিনি আরও জানান, ৩০ লাখ টাকার মধ্যে ১০ লাখ টাকার চেক হস্তান্তর করে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি টাকাও হস্তান্তর করা হবে। পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ৪ শতক জায়গায় ঘর নির্মাণের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠানো হবে।
.png)

