logo
Advertisement

ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে সুরমা, অনিশ্চিত জেডিসি পরীক্ষা

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ,পিরোজপুর
ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে সুরমা, অনিশ্চিত জেডিসি পরীক্ষা
কিশোরী সুরমা আক্তারের পাশে তার মা ও স্বজন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ১৫ বছরের কিশোরী সুরমা আক্তার। শরীরে তীব্র জ্বর, গলা ব্যথা, কাশি ও মুখে সংক্রমণ। কয়েক দিন আগেও সহপাঠীদের সঙ্গে পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল সে। কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষায় অংশ নেওয়া নিয়ে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা।

Advertisement

সুরমা আক্তার পিরোজপুরের পার্শ্ববর্তী বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার রামচন্দ্রপুর ইউনিয়নের কামলা গ্রামের দিনমজুর এনামুল সরদারের মেয়ে। সে স্থানীয় জিলবুনিয়া মহিলা মাদ্রাসার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

সম্প্রতি জেডিসি পরীক্ষার আগের মূল্যায়ন পরীক্ষা চলাকালে হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে সুরমা। অসুস্থতার কারণে এরই মধ্যে তিনটি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি সে। ফলে মূল্যায়ন পরীক্ষায় পাস করতে না পারলে চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে কি না—এ নিয়ে এখন চরম উদ্বিগ্ন সে ও তার পরিবার।

সুরমা আক্তার বলে, আমার শরীরে জ্বর, গলা ব্যথাসহ অনেক অসুস্থতা দেখা দিয়েছে। এ কারণে তিনটি পরীক্ষা দিতে পারিনি। ম্যাডামরা বলছেন, টেস্ট পরীক্ষায় পাস করতে না পারলে ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারব না। এখন আমি খুব চিন্তায় আছি।

সুরমার মা বিউটি বেগম বলেন, আমার মেয়ের জ্বর, কাশি, গলা ব্যথা ও মুখে ইনফেকশন হয়েছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর পর ডাক্তার বলেছেন, মেয়ের ডেঙ্গু হয়েছে। আমার এক ছেলে ও দুই মেয়ে; সুরমা ছোট মেয়ে। ওর পরীক্ষা চলছিল, কিন্তু অসুস্থ হয়ে তিনটি পরীক্ষা দিতে পারেনি। এখন আমরা চিন্তায় আছি, ফাইনাল পরীক্ষা দিতে পারবে কি না।

শুধু সুরমা নয়, পিরোজপুর জেলা হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলা হাসপাতালে ৩৯ জন নারী, পুরুষ ও শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এর মধ্যে সুরমার মতো অনেক রোগীই পার্শ্ববর্তী মোড়েলগঞ্জ এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসছেন।

এ ছাড়া জেলার নাজিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৪ জন, নেছারাবাদে ১৫ জন, কাউখালীতে ১ জন, ভান্ডারিয়াতে ১৫ জন এবং মঠবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা মোড়েলগঞ্জের আরেক রোগীর স্বজন মো. কাওসার বলেন, আমার স্ত্রীর ভাইয়ের মেয়ের জ্বর হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। চিকিৎসক কয়েকটি পরীক্ষা দিয়েছেন। হাসপাতালে পরীক্ষা না হওয়ায় বাইরে থেকে করিয়ে এনেছি। পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। আমাদের বাড়ি মোড়েলগঞ্জে, তবে পিরোজপুরের এই হাসপাতাল কাছে হওয়ায় এখানে এসেছি।

জ্বর নিয়ে হাসপাতালে আসা মধ্যবয়সী নারী হাওয়া বেগমের শরীরেও ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। তিনি বলেন, হঠাৎ শরীরে জ্বর আসে, সঙ্গে পেট ফুলে ওঠে। পরে হাসপাতালে এসে পরীক্ষা করালে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। ডাক্তার যে ওষুধ দিয়েছেন, সবই খাচ্ছি। কিন্তু এখনো শরীর ভালো লাগছে না।

ডেঙ্গু রোগীর পাশাপাশি জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে অন্যান্য রোগে আক্রান্ত রোগীরাও। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।

হামে আক্রান্ত এক শিশুর মা রেহেনা বেগম বলেন, আমার ছেলে হাম রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তাই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছি। এখন আবার যদি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়, সেই ভয় হচ্ছে। এখানে ডেঙ্গু রোগী ও সাধারণ রোগীদের একসঙ্গে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

পিরোজপুর জেলা হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. সুরঞ্জিত কুমার সাহা বলেন, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমছে না; বরং দিন দিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমরা আশা করেছিলাম হয়তো রোগীর চাপ কিছুটা কমে যাবে, কিন্তু প্রতিদিনই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। একজন ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় প্রায় পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগে। এর মধ্যেই নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। পাশাপাশি অন্যান্য রোগীও হাসপাতালে ভর্তি থাকায় সামগ্রিকভাবে রোগীর চাপ বেড়েছে।”

তিনি আরও বলেন, বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগী মোড়েলগঞ্জের বাদাল এলাকা থেকে আসছেন। এ ছাড়া পিরোজপুরের বিভিন্ন এলাকা এবং পার্শ্ববর্তী জেলা থেকেও রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

পিরোজপুরের সিভিল সার্জন ডা. মো. মতিউর রহমান বলেন, জেলায় ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জেলা হাসপাতালে পৃথক ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়েছে। রোগীদের সার্বক্ষণিক চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ মেডিকেল টিমও গঠন করা হয়েছে। অধিকাংশ বাড়িতে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সুপারি গাছ কাটার পর অবশিষ্ট অংশে পানি জমে থাকে। এ ছাড়া বাড়ির আঙিনার বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানিতেও এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে সিভিল সার্জন বলেন, স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে। প্রতি শনিবার 'ক্লিনিং ডে' পালন করা হয়। হাসপাতালের আশপাশে নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালানো হচ্ছে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে লিফলেট তৈরি করে মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ জেলা হাসপাতাল ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন; আমরা সচেতন হলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিষয় :