হবিগঞ্জে পরিবহন ধর্মঘট, শ্রীমঙ্গলে যাত্রীদের চরম ভোগান্তি

হবিগঞ্জের পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন এলাকায় দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছেন শত শত যাত্রী। কেউ জরুরি কাজে বাড়ি ফিরতে পারছেন না, কেউ চিকিৎসকের কাছে যেতে পারছেন না। আবার কেউ স্বজনের মৃত্যু কিংবা পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে না পেরে ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সকাল থেকে শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ড ও বিভিন্ন পরিবহন কাউন্টারে গিয়ে বাস না পেয়ে অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।
ঢাকা থেকে বুধবার রাতে বন্ধুদের নিয়ে শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে এসেছিলেন হেলাল। বৃহস্পতিবার তাদের শ্রীমঙ্গল ঘুরে দেখার কথা ছিল। সকালে খবর পান, তার খালা মারা গেছেন। এরপর ভ্রমণ বাতিল করে বন্ধুদের নিয়ে ঢাকা ফেরার জন্য শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন বাস কাউন্টারে যান তিনি। কোনো বাস না পেয়ে একপর্যায়ে শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারের এক পাশে বিষণ্ন হয়ে বসে থাকতে দেখা যায় তাকে।
হেলাল বলেন, ‘আমার খালা আমাকে খুব ভালোবাসতেন। ছোটবেলা থেকে আমাকে মানুষ করেছেন। কিন্তু পরিবহন বন্ধ থাকায় তাকে শেষবারের মতো দেখতেও যেতে পারছি না।’
এদিকে ঢাকার বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসকের সিরিয়াল নেওয়া থাকায় বিপাকে পড়েছেন আরেক যুবক শিমুল রহমান। তার মামাকে নিয়ে নির্ধারিত সময়ে হাসপাতালে যাওয়ার কথা থাকলেও বাস চলাচল বন্ধ থাকায় তিনি ঢাকায় যেতে পারছেন না।
শুধু জরুরি কাজে থাকা যাত্রীই নন, শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটকও পড়েছেন ভোগান্তিতে। কেউ হোটেল ছেড়ে বাড়ির উদ্দেশে বের হয়েও যানবাহন না পেয়ে আটকে আছেন। আবার কারও পূর্বনির্ধারিত হোটেল বুকিং শেষ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে থাকার খরচ বহন করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শ্রীমঙ্গল হয়ে হবিগঞ্জের বিরতিহীন বাস চলাচল নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে হবিগঞ্জের মোটর মালিক গ্রুপ ও মৌলভীবাজারের এসএমএস বাস মালিক-শ্রমিকদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। আলোচনার পর শ্রীমঙ্গলে যাত্রাবিরতি না দিয়ে মৌলভীবাজার ও শেরপুরে যাত্রাবিরতি রেখে হবিগঞ্জের বিরতিহীন বাস চলাচল অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। তবে এর পরও দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কাটেনি। এর মধ্যে পরিবহন শ্রমিকদের মারধর, বাস আটকে রাখা ও ভাঙচুরের অভিযোগ তুলে বৃহস্পতিবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয় হবিগঞ্জের পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলো।
হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল বলেন, মৌলভীবাজারের এসএমএস পরিবহনের মালিক-শ্রমিকরা শেরপুর এলাকায় হবিগঞ্জের বিরতিহীন বাসের চালক ও শ্রমিকদের আটকে রেখে মারধর এবং একটি বাসে ভাঙচুর করেছেন। বর্তমানে হবিগঞ্জের তিনটি বাস এসএমএস পরিবহনের লোকজন তাদের কার্যালয়ের সামনে আটকে রেখেছে। এরই প্রতিবাদে তারা ধর্মঘটের ডাক দিয়েছেন।
সোহেলের ভাষ্য, এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবিগঞ্জের বাসগুলো নির্বিঘ্নে চলাচলের দাবিতে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চলবে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সদস্য সচিব ও এসএমএস বাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম রিপন। তিনি বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে বিষয়টি সমাধানের আলোচনা চলছিল এবং পরিস্থিতিও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছিল। এর মধ্যেই হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের লোকজন শ্রীমঙ্গলে এসএমএস পরিবহনের কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি দাবি করে বলেন, ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কারণেই পরিস্থিতি আবারও জটিল হয়েছে।
হবিগঞ্জের পরিবহন শ্রমিক নেতা ছায়েদ আলী বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে তারা গিয়েছেন। কিন্তু কার্যকর সমাধান না হওয়ায় তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। বাধ্য হয়েই ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।