বিয়ের আনন্দের বদলে ইসমাইলের বাড়িতে শোকের মাতম

মেয়ের হাতে মেহেদি পরানোর স্বপ্ন নিয়ে শেষ সম্বল ভিটেমাটির একটি অংশ বিক্রি করেছিলেন বাবা। কথা ছিল, সেই টাকায় ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দেবেন। বাকি অর্থ দিয়ে কিনবেন একটি ইজিবাইক। নতুন করে ঘুরে দাঁড়াবে সংসার। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। ঘাতকদের নির্মমতায় মেয়ের বিয়ের আনন্দের বদলে এখন জামালপুরের ইসমাইল হোসেনের বাড়িতে বইছে শোকের মাতম।
জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামের বাসিন্দা ইসমাইল হোসেন একমাত্র মেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে নিজের ১০ শতাংশ জমি বিক্রি করেছিলেন। ঋণ ও সংসারের বিভিন্ন খরচ মিটিয়ে হাতে রেখেছিলেন প্রায় ৫ লাখ টাকা। পরিকল্পনা ছিল, সেই টাকা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেবেন এবং অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে একটি ইজিবাইক কিনে জীবিকার নতুন পথ তৈরি করবেন।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার রাতে ওই টাকা সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের উদ্দেশে রওনা হন ইসমাইল হোসেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ঘটে মর্মান্তিক ঘটনা। শুক্রবার সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী এলাকায় মুখে স্কচটেপ পেঁচানো অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
শনিবার রাতে তার দাফন সম্পন্ন হলেও শোক কাটেনি পরিবারের। যে বাড়িতে কয়েক দিন পর বিয়ের সানাই বাজানোর কথা ছিল, সেখানে এখন শুধুই কান্নার রোল।
প্রতিবেশীরা জানান, মেয়ের বিয়ে নিয়ে খুবই আশাবাদী ছিলেন ইসমাইল হোসেন। জমি বিক্রির টাকায় বিয়ের পাশাপাশি সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়েও পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি।
ইসমাইল হোসেনের ভাগিনা স্বপন বলেন, বাড়ির ভিটেমাটির একটা অংশ বিক্রি করে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে গিয়েছিলেন। কিছু টাকা দিয়ে মেয়ের বিয়ে দেবেন, আর কিছু টাকা দিয়ে একটি অটো কিনে সংসার চালাবেন—এমন স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু কেন তাঁকে এভাবে মারল, তা আমরা জানি না। আমরা কবরের মাটি শুকানোর আগেই এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও সুন্দর বিচার চাই বাংলাদেশ সরকারের কাছে।
ঘটনার আগে দিগপাইত স্ট্যান্ডে ইসমাইল হোসেনকে এক অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলেন স্থানীয় ভ্যানচালক রফিক ইসলাম।
তিনি বলেন, দিগপাইত স্ট্যান্ডে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন ইসমাইল ভাই। সেখানে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলেন। ইসমাইল ভাই তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোথায় যাবেন। তিনি বলেছিলেন, বনানী। পরে ওই ব্যক্তিও ইসমাইল ভাইকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি কোথায় যাবেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ঢাকার জিরানীতে যাবেন।
পরিবারের দাবি, ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে থাকা ৫ লাখ টাকা এখনও উদ্ধার হয়নি। যে টাকা ঘিরে ছিল মেয়ের বিয়ে, পরিবারের ভবিষ্যৎ এবং নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন।
নিহতের স্ত্রী হাসনা বেগম বলেন, মেয়ের বিয়ের জন্য ভিটেমাটির জায়গা বিক্রি করে টাকা নিয়ে আমার স্বামী রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু পথে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। আমি আমার স্বামীর হত্যার সুষ্ঠু বিচার চাই।
নিহতের ছেলে মো. হাসান বলেন, আমরা গাজীপুরে থাকতাম। বৃহস্পতিবার রাতে আব্বা ফোন করে বলছিলেন, তিনি জামালপুর থেকে রওনা হয়েছেন, সকালে গাজীপুরের জিরানীতে নামবেন। আমি নির্ধারিত সময়ের আগেই সেখানে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু অনেকক্ষণ পার হলেও তিনি আসেননি। পরে ফোন দিলে নম্বর বন্ধ পাই। কিছুক্ষণ পর থানা থেকে ফোন করে জানানো হয়, আব্বার দুর্ঘটনা হয়েছে। সেখানে গিয়ে জানতে পারি, আব্বার হাত-পা বাঁধা এবং মুখে স্কচটেপ লাগানো অবস্থায় তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
বোনের বিয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, বরপক্ষ আমাদের সময় দিয়েছে। এই শোক কাটিয়ে পরে বিয়ের আয়োজন করব। কিন্তু টাকাগুলো এখনও উদ্ধার হয়েছে কি না, সে বিষয়ে আমরা কিছু জানি না।
পরিবারটির মানবিক সহায়তার বিষয়ে জানতে চাইলে জামালপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাজনীন আখতার বলেন, বিষয়টি আমরা গণমাধ্যমের মাধ্যমে জেনেছি। পরিবার থেকে এখনো কোনো আবেদন পাইনি। তবে তারা আবেদন করলে বিধি-বিধানের আলোকে মানবিক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
শুক্রবার সকালে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের বনানী এলাকায় মুখে স্কচটেপ পেঁচানো অবস্থায় ইসমাইল হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রযুক্তির সহায়তায় এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করে তিন পরিবহন শ্রমিককে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।


