logo

মাটির নিচে সুড়ঙ্গ বানিয়ে ২৬ বছর ধরে সাধনা করেন লাভলী

মাটির নিচে সুড়ঙ্গ বানিয়ে ২৬ বছর ধরে সাধনা করেন লাভলী
চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার ঘোলদাড়ী গ্রামে মাটির নিচের সুড়ঙ্গ কক্ষে ধ্যানে মগ্ন সাধক লাভলী শাহ ফকির রানী। ছবি : এশিয়া পোস্ট

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঘোলদাড়ী গ্রামের বাইরে নির্জন এক প্রান্তর। স্থানীয় মানুষের কাছে জায়গাটি পরিচিত ‘বেইলের মাঠ’ নামে। প্রায় ২৬ বছর আগেও জঙ্গলাকীর্ণ এই মাঠে মানুষের চলাচল ছিল খুবই কম। সেই মাঠের সাড়ে সাত শতক জমিতে গড়ে উঠেছে ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ নামের একটি আশ্রম। আশ্রমের টিনের চালার নিচে রয়েছে মাটির গভীরে নেমে যাওয়া সিঁড়ি। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামলে পাওয়া যায় সুড়ঙ্গের মতো অন্ধকার একটি কক্ষ। সেখানে প্রায় ২৬ বছর ধরে ধ্যান ও সাধনা করছেন লাভলী শাহ ফকির রানী নামের এক নারী।

আশ্রমে রয়েছে আরও একটি টিনের ঘর। নির্জন এই আশ্রমে তার সঙ্গে থাকেন দুজন খাদেম। তাদের একজন মাহবুব আলম বাচ্চুর বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। অন্যজন আলভী বেগমের বাড়ি রংপুর জেলায়।

দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে লাভলী শাহর সঙ্গে রয়েছেন মাহবুব আলম বাচ্চু। তিনি বলেন, এটা দমের মাদারের দরবার। দমের মাদার বলতে মা বোঝায়। মা আর আমি এখানে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সাধনা করছি। এখানে সাধুসঙ্গ হয়, ফলসেবা দেওয়া হয়।

লাভলী শাহর নিজের গর্ভে সন্তান নেই। তবে তার দাবি, জীবনের বিভিন্ন সময়ে ২০ জনের বেশি এতিম ও পথশিশুকে আশ্রয় দিয়ে লালন-পালন করেছেন তিনি। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগছেন লাভলী শাহ। এর মধ্যেও আশ্রমে ধ্যান ও সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে আশ্রমে তার দীর্ঘদিনের বসবাসের অভিজ্ঞতা সব সময় নির্বিঘ্ন ছিল না। লাভলী শাহর ভাষ্য, নির্জন এই আশ্রমে একাধিকবার ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। পিস্তল ঠেকিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া লালন শাহকে নিয়ে লেখা তার দীর্ঘদিনের সংগ্রহে থাকা একটি ডায়েরিও হারিয়ে গেছে।

নিজের অতীত সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য মনে করতে পারেন না লাভলী শাহ। তার বয়স, বাবা-মায়ের পরিচয় কিংবা জন্মস্থান সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা নেই বলে জানান তিনি। তবে তার দাবি, ইরাক থেকে পাকিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে এসেছেন তিনি।

শৈশবের স্মৃতিচারণা করে লাভলী শাহ বলেন, পাঁচ বছর বয়সে তিনি ইরাকে ছিলেন। সেখানে এক ব্যারিস্টারের বাড়ির বাইরে তার দিন কাটত। পরে ১১ বছর বয়সে এক সাধু তার নাম রাখেন লাভলী। ওই গুরুর সান্নিধ্যে তিনি আধ্যাত্মিক দীক্ষা নেন। পরবর্তী সময়ে লালন শাহের দর্শনে উদ্বুদ্ধ হন।

লাভলী শাহর দাবি, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের আগেই তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন। ২০০০ সালে ঘোলদাড়ী গ্রামের এই নির্জন প্রান্তরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। এর আগে অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান ও ভারত ঘুরেছেন বলেও জানান লাভলী শাহ।

মাটির নিচের কক্ষে সাধনার বিষয়ে তিনি বলেন, এই জায়গাটা আমি ১৯৭৯ সাল থেকে খুঁজে বেড়াতাম, পাইতাম না। অনেক খুঁজে ২০০০ সালে এখানে আসি। সর্বক্ষণ ওই ধ্যানের মাধ্যমেই থাকতাম। দিনের বেলা ছেলেপেলেদের সঙ্গে থাকতাম, আর রাতে সুড়ঙ্গে আমার কাজগুলো করতাম। সাধনা আরকি।

আশ্রমে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উপস্থিতি এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের দেবদেবীর মূর্তি রাখার কারণ জানতে চাইলে লাভলী শাহ বলেন, ‘মানবধর্মই বড় ধর্ম।’

তার ভাষ্য, বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিলে জাতপাত বা ধর্মীয় ভেদাভেদ নেই। মানবধর্ম ও মানুষের প্রতি ভালোবাসাই এখানকার মূল শিক্ষা।

লাভলী শাহ জানান, আশ্রম পরিচালনার জন্য তিনি সরকারি কোনো সাহায্য বা অনুদান পাননি। তবে এ নিয়ে কারও প্রতি তার ক্ষোভ বা অভিযোগ নেই। মানুষের ভালোবাসা নিয়েই জীবনের বাকি সময় কাটাতে চান তিনি।

নিজের শেষ ইচ্ছার কথা জানিয়ে লাভলী শাহ বলেন, কোনো সরকার অনুদান দেয় নাই, তাতে কিছু না। আমার মৃত্যুর পর এখানে আমারে রাইখা দিও।

ঘোলদাড়ি গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন আশ্রমের পরিবেশ সম্পর্কে বলেন, লাভলী শাহ আসার আগে এই মাঠে কোনো ফসলের আবাদ হতো না। এখন এখানে প্রচুর ফসল উৎপাদিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক সাধু-গুরু নানা ধরনের আজেবাজে কথা বলেন, কিন্তু তাঁর মধ্যে কোনো ভণ্ডামি নেই। সাধারণত বিভিন্ন আখড়া বা আশ্রমকে ঘিরে যেসব নেতিবাচক ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের কথা শোনা যায়, এখানে তেমন কিছু ঘটে না বলেও দাবি করেন তিনি।

তার ভাষ্য, দিন-রাত ধ্যান ও মানবসেবা নিয়েই ব্যস্ত থাকেন লাভলী শাহ ও তার খাদেমরা।